আবিদ ফায়সালের একগুচ্ছ কবিতা
আবিদ ফায়সালের একগুচ্ছ কবিতা


নয়টি গর্গনের ডিম


নয়টি গর্গনের ডিম
আমার ঘরের কড়িকাঠে ঝুলছিল।
রাতভর তারা
চাঁদের নিদ্রার অবসরে
ধীরে ধীরে সবুজ হয়ে উঠছিল।

প্রথম ডিম ফেটে বেরোল
হারমিসের হারানো ছায়া।
সে পৃথিবীর সব রাস্তা মুছে দিয়ে
শুধু বাতাসের পদচিহ্ন রেখে গেল।

দ্বিতীয় ডিমের ভিতর
অর্ফিয়ুসের কণ্ঠ ছিল
কিন্তু কোনও মুখ ছিল না।
সেই কণ্ঠে পাথরেরা গান গাইল
মানুষেরা নীরব হয়ে গেল।

তৃতীয় ডিম খুলতেই
সেডনার বিচ্ছিন্ন আঙুল থেকে
সমুদ্র ঝরে পড়ল।
ভোর হলে
প্রথম মাছটি
একটি শাপলার মতো খুলে গেল।

চতুর্থ ডিমে
ইগড্রাসিলের একটি শিকড়
আকাশের দিকে বাড়ছিল।
তার পাতায়
পাখিরা নয়
বাতাস ডিম পাড়ছিল।

পঞ্চম ডিমের ভিতর
মেডুসার একটি চুল
এখনও সাপ হতে শেখেনি।
একটি মাকড়সা
তাকে দিয়ে অন্ধকারের কপালে
নক্ষত্রের জাল বুনছিল।

ষষ্ঠ ডিম খুলতেই
আনুবিস একটি ভাঙা ঘড়িকে
মমি বানিয়ে
মৃত শতাব্দীর পাশে শুইয়ে দিল।

সপ্তম ডিম থেকে
একটি ফিনিক্স উড়ে এলো—
সে আগুন থেকে নয়
অজন্মা সূর্যের ছাই থেকে জন্মেছিল।

অষ্টম ডিমে
একটি মিনোটর
নিজের গোলকধাঁধা খেয়ে ফেলছিল।
তার বুকের ভিতর
প্রথমবারের মতো
একটি সরল পথ জন্ম নিল।

নবম ডিমটি
কোনওদিন ফুটল না।

আজও মাঝরাতে
কড়িকাঠের দিকে তাকালে
দেখি—
ডিমটির ভিতর থেকে
অদেখা কেউ
ধীরে ধীরে
আমাকে স্বপ্ন দেখছে।

টরন্টো
১৩ জুলাই ২০২৬ 



ছাইফুল


ভোর হলে
চড়ুইরা খড়ের গাদায় রেখে যায়
কয়েকটি সোনালি নিশ্বাস।

মা সেগুলো কুড়িয়ে শিলপাটায় বাটে;
গন্ধ ছড়িয়ে পড়ে তুলসীতলার শিকড়ে।

সেই গন্ধে একটি অন্ধ কেঁচো
মাটি সেলাই করে,
একটি শামুক তার পিঠে বয়ে আনে
বর্ষার প্রথম দুধ।

বিকেলের শেষে
গোলাঘরের দরজায়
কে যেন নিঃশব্দে একমুঠো খোসা রেখে যায়—
গ্রামের বুড়িরা বলে,
এসব অন্নদাসীর পায়ের ধুলো,
ফেলে দিতে নেই।

রাতে চুলোর ছাই উসকে দিলে
জেগে ওঠে,
ধানের পোয়াতি ছায়া।

মা, এক চিমটি সেই ছায়া
আমার থালায় দিও।

মানুষ সব সময়ে ভাতে বাঁচে না—
কখনও কখনও একমুঠো বিশ্বাসেও
মোরগসকাল ডেকে ওঠে।

টরন্টো
২৪ জুলাই ২০২৬ 




জুতোর ভিতর নদী
     

একদিন দেখি আমার জুতোর ভিতর একটি নদী
নোঙর করেছে।
ফিতা খুলতেই দু-তিনটি মাছ লাফ দিয়ে ঘরে ঢুকে
বইয়ের আলমারিতে আশ্রয় নিল।
আমি তাদের ধরতে গেলে তারা অভিধানের পাতা উলটে
'জল’ শব্দটি মুছে দিল।

সেই থেকে পিপাসা পেলে আমি জলের দরজা খুলি না
পুরোনো জুতোর কাছে বসে থাকি।
ওখান থেকে ধীরে ধীরে ভেসে আসে
ডুবে যাওয়া নৌকার ঘণ্টাধ্বনি
একজন মাঝির অসমাপ্ত হাই
এবং আমার মৃত দাদার কাশির শব্দ।

রাতে জুতোগুলো বারান্দায় রেখে দিই।
ভোরে দেখি তারা আর জুতো নেই—
দুটি সন্তরণশীল নদী
একজোড়া পায়ের সন্ধানে
পৃথিবীর মানচিত্রের ওপর দিয়ে চলে যাচ্ছে।

আমি তখন খালি পায়ে দাঁড়িয়ে ভাবি
মানুষ কি সত্যিই জুতো পরে?
নাকি জুতোগুলোই আমাদের পায়ে পায়ে হাঁটিয়ে
নিজেদের গন্তব্যে পৌঁছে দেয়?

এমন সময় দরজায় কড়া নাড়ে বৃষ্টি।
দরজা খুলে দেখি—
সে তার ভেজা পা থেকে খুলে রাখা একজোড়া মেঘ খুঁজছে।

টরন্টো
৬ জুলাই ২০২৬



ধানখেত থেকে উঠে আসা বৃহস্পতিবার

আজ ভোরে
ধানখেতের আল থেকে
একটি বৃহস্পতিবার উঠে এলো।

কেউ বিস্মিত হলো না।
গোরুগুলো শুঁকে নিয়ে
আবার ঘাসে মুখ দিল।

বাঁশবনের ভিতর
এক বৃদ্ধ শুকোতে দিয়েছেন শৈশব—
হাওয়া লাগলেই
নীল ধুলো হয়ে উড়ে আসে।

পুকুরের তলায়
অনেকদিন ধরে একটি ডাকঘর রয়েছে।
মাছেরা চিঠি লেখে না,
শুধু ডাকটিকিট ভিজিয়ে রাখে।

গত শীতে
আমাদের কুয়ো বদলে নিয়েছিল
নিজের অন্ধকার
একমুঠো সরিষা ফুলের বিনিময়ে।

এখন যে জল তোলে
তার কণ্ঠে জেগে ওঠে
মাটির নিচের ব্যাকরণ।

হাটে আজ
শাকসবজি নেই—
এক বুড়ি মেপে দিচ্ছে
চার সের বিকেল,
আধ সের নীরবতা।

দাঁড়িপাল্লার এক পাশে
চড়ুইয়ের ছায়া,
অন্য পাশে
অসমাপ্ত বংশলতিকা।

রাতে
বাড়ির দরজারা মাঠে চরতে যায়।
ভোরে ফিরে এসে
কাঠের গায়ে রেখে যায়
অচেনা নক্ষত্রের বীজ।

এখন আকাশ আর উপরে নেই।
শিশুরা ঘুড়ি ওড়াতে গিয়ে
মাটির নিচে নেমে যায়।

এক ভাঙা কলসি বলেছিল—
পৃথিবীর বয়স তখনই শুরু,
যেদিন একটি বীজ
নিজের ছায়াকে গাছ ভেবেছিল।

সেদিন থেকে
পাথরেরা ঋতু গুনছে।

আমাদের গ্রামের মানচিত্রে
এখন কোনও রাস্তা নেই—
শুধু বাতাস,
মাটি,
আর কিছু জানালা
যেখানে এখনও
অজন্মা বৃষ্টি বসে থাকে।

টরন্টো
২২ জুলাই ২০২৬



লবণের অস্থিমজ্জা


যেদিন প্রথম আমার নামটি
নিজের স্মরণ থেকে সরে গেল
সেদিন একটি সিঁড়ি
তার সব ধাপ গুটিয়ে
একটি পাখির হাঁটুতে আশ্রয় নিল।

আমি বহুদিন ধরে
একটি কাচের বীজ পুষছিলাম।

হঠাৎ দেখি
তার ভিতর থেকে জন্ম নিচ্ছে
কোনও গাছ নয়
একটি বিকেল—
যার ছায়ায় বসে
অন্ধকার
নিজের ভিতরের রাত গুনছিল।

আমার ডান হাত
প্রতিদিন একটু একটু করে 
বাম দিকের ভবিষ্যৎ হয়ে উঠছিল।

তাই আঙুলের ছাপগুলো
রাতে খুলে রেখে দিতাম
জলের নিচে।

ভোর হলে
তারা ফিরে আসত
অন্য কারও বিস্মরণ নিয়ে।

একদিন
একটি বিরামচিহ্ন
আমার দরজায় এসে বলল—
'আমি বহুদিন ধরে
একটি বাক্যের বাইরে বাস করছি।'

আমি তাকে ঘরে তুলতেই
দেয়ালের চুন
নিজেদের হাড় হয়ে
অস্থিমজ্জার ভিতর ঢুকে গেল।

তারপর থেকে
ঘুম ভাঙলে দেখি
আমার বালিশের নিচে
কেউ একজন
ধীরে ধীরে
লবণের ভিতরের কঙ্কাল বুনছে।

আমি তাকে কখনও দেখি না।

শুধু লক্ষ করি—
সমুদ্র
প্রতিদিন
নিজের অস্থিমজ্জা থেকে
একটু একটু করে
লবণ হারাচ্ছে।

টরন্টো
১৮ জুলাই ২০২৬



যতিচিহ্নদের গণতন্ত্র
 
রাতের সংসদ বসেছে ভাষার ভিতরে।
সভাপতি হওয়ার দাবিতে
প্রথমেই দাঁড়িয়ে গেল কোলন :
'আমিই পথ খুলে দিই।
আমার পরে আসে ঘোষণা,
আইন, আদেশ, বিপ্লব,
এমনকি প্রেমপত্রও।
আমাকে ছাড়া সভ্যতা কেবল হাঁপাতে থাকা বাক্য।'

কমা তখন কাশি দিয়ে বলল—
'ধীরে, ধীরে।
তুমি শুধু দরজা খোলো
ঘরের ভিতর বাতাস চালাই আমি।
আমাকে বাদ দিলে
মানুষ শ্বাস নিতে নিতে মরে যাবে।'

দাঁড়ি এতক্ষণ চুপ ছিল।
তার স্বভাবই এমন।
শেষ মুহূর্তে এসে
সবাইকে থামিয়ে দেয়।
সে গম্ভীর স্বরে বলল—
'তোমরা সবাই অতিরিক্ত কথা বলো।
শেষ কথা বলি আমি।
রাষ্ট্রও শেষ পর্যন্ত
আমার কাছেই আত্মসমর্পণ করে।'

এই কথা শুনে
সেমিকোলন মৃদু হেসে উঠল—
যেন বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনও অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক।
'তোমরা সবাই চরমপন্থি।
আমি সংযোগ জানি।
বিরোধী দুটো ভাবনাকে
রক্তপাত ছাড়াই পাশাপাশি বসাতে পারি।
সভ্যতার আসল ভদ্রতা আমি।'

ড্যাস এতক্ষণ দেয়ালে হেলান দিয়েছিল।
হঠাৎ উঠে দাঁড়িয়ে
সভাকক্ষের মাঝখান চিরে দিল—
'ভদ্রতা?
এসব ভদ্রতা আসলে ক্ষমতার অলংকার।
মানুষ যখন কথা বলতে বলতে
হঠাৎ থেমে যায়—
যেখানে ভয় ঢুকে পড়ে—
সেখানে আমি জন্মাই।
আমি বিচ্ছেদ
আমি গোপন ফাইল
আমি সেন্সর করা বাক্যের কালো দাগ।'

বিস্ময়সূচক চিহ্ন টেবিলে আঘাত করল—
'চুপ!
জনগণ উত্তেজনা চায়।'

প্রশ্নবোধক তখনও সন্দিহান—
'জনগণ বলতে কাদের বোঝানো হচ্ছে?'
বন্ধনী দুই পাশে বসে
সব শুনছিল।
তাদের কাজই আড়ালে থাকা।
তারা ফিসফিস করে বলল—
'মূল ইতিহাসের চেয়ে
ফুটনোটই দীর্ঘস্থায়ী।'

উদ্ধৃতি চিহ্ন
অন্যের কথা নিজের মুখে বসিয়ে
বলল—
'সত্য বলে কিছু নেই;
যা উদ্ধৃত হয়
তা-ই সত্য হয়ে যায়।'

কমা আবার কথা বলতে চাইল
কিন্তু দাঁড়ি তাকে থামিয়ে দিল।
কোলন বলল, 'নিয়ম মানুন:'
তারপর নিজের লোকদের নাম পড়তে শুরু করল।

সেমিকোলন প্রতিবাদ করল;
তার মাইক বন্ধ হয়ে গেল।
ড্যাস হেসে উঠল—
দীর্ঘ, কালো, বিপজ্জনক হাসি—
'দেখলে তো?
যতিচিহ্নের রাজনীতিও
মানুষের রাজনীতির মতো।
এখানে বড়ো হওয়ার মানে
অন্যের বাক্য ছোটো করে দেওয়া।'

এমন সময়
একটি ক্ষুদ্র ফুলস্টপ
সভাকক্ষের কোণে বসে থাকা
এক দরিদ্র বাক্যের পাশে গিয়ে দাঁড়াল।
বাক্যটি বহুদিন ধরে
শেষ হতে পারছিল না।
কেউ তাকে পূর্ণতা দিচ্ছিল না।
দাঁড়ি চুপচাপ তার শেষে বসে পড়ল।
হঠাৎ
পুরো ভাষাজুড়ে নেমে এলো নীরবতা।
সবাই বুঝল—
সবচেয়ে ছোটো দেখালেও
শেষ পর্যন্ত ক্ষমতা তারই—
স্পিকারের মতো যে থামাতে জানে।

টরন্টো
২০ মে ২০২৬

সাবস্ক্রাইব করুন! মেইল দ্বারা নিউজ আপডেট পান