কবিতা কখনো এক জায়গায় থেমে থাকেনি। কবিতার আঙ্গিক, প্রকরণ ও ভাষা প্রবাহমান নদীর মত সময়ের বাঁকে বাঁকে পরিবর্তিত হয়েছে।বাংলা কবিতার আদি নিদর্শন চর্যাপদের যে ভাষা,তাকে অতিক্রম করে পরবর্তীতে রচিত হয় শ্রীকৃষ্ণকীর্তন, বৈষ্ণব পদাবলী হয়ে মঙ্গলকাব্য। মাইকেল মধুসূদন দত্ত এবং বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথের হাত ধরে পাশ্চাত্য কাব্য-রুচির সঙ্গে বাংলা কবিতার সংযোগ ঘটে। এবং প্রথমবারের মতো বাংলা কবিতায় আধুনিক ইউরোপীয় কবিতার অভিঘাত আমরা লক্ষ্য করি।বিগত কয়েক শতাব্দী ধরে বাংলা কবিতা যতটুকু অগ্রসর হয়েছিল, এই দুই মহান দিকপালের আবির্ভাবে কবিতার দিগন্ত বহুদূর পর্যন্ত বিস্তৃত হয় । কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের রোমান্টিক গীতি কবিতায় মোহাচ্ছন্ন হয় বাংলার কাব্য-আকাশ।এরই মাঝে বিকশিত হতে শুরু করে এই মোহমুগ্ধতার বন্ধন থেকে মুক্তির আকাঙ্ক্ষা ।ইংরেজি তথা পাশ্চাত্যের সাহিত্য পাঠ করা এক ঝাঁক মেধাবী তরুনের অদম্য প্রয়াসে বাংলা কবিতার প্রকরণ এবং ভাষায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন সূচিত হয়।
কবিতায় নতুন প্রকরণ এবং আঙ্গিক নির্মাণের আরেকটি সচেতন এবং সংঘবদ্ধ প্রয়াস গড়ে ওঠে আশির দশকের মাঝামাঝি থেকে।এবং নব্বই দশকে এসে তা অনেকটাই সাফল্য মন্ডিত হয়। নতুনের প্রতি মানুষের যে আকাঙ্ক্ষা তা কখনো থেমে থাকে না। মানুষ সব সময় নতুন পথের সন্ধান করে,নতুনকে স্বাগত জানাতে উন্মুখ হয়ে ওঠে।তাছাড়া মানুষ পরিবর্তন চায়, পরিবর্তনের স্বপ্ন তাকে সর্বদাই তাড়িত করে।
নব্বইয়ের দশকে বাংলাদেশের আধুনিক কবিতার একটা বাঁক বদল ঘটে এবং কবিতা একটা নতুন রুপ লাভ করে।সেই সাথে কিছু লিটল ম্যাগকে কেন্দ্র করে চোরা স্রোতের মত কবিতার আরেকটি ধারার একটা ক্ষীণ প্রবাহ লক্ষ্যযোগ্য হতে থাকে । শুরুতে স্পষ্ট না হলেও এখন এটা পরিস্কার যে, নব্বইয়ের আধুনিকতাকে পেছনে ফেলে কবিতায় একটা পরিবর্তন ঘটতে যাচ্ছে অথবা এখনই সেটা ঘটলেও কালের অনিবার্য নিয়মেই তা ঘটবে। পাশ্চাত্যে এই পরিবর্তন ঘটেছে যার নাম দেওয়া হয়েছে পোস্টমডার্নিজম যা বাংলায় উত্তরাধুনিকতা।উত্তরাধুনিকতা এমন একটি প্রবণতা যেখানে কোনো তত্ত্ব, দর্শন,জ্ঞান-বিজ্ঞান,এমনকি ধর্ম বিশ্বাসকেও বিনা প্রশ্নে মেনে নেওয়া হয়না।বস্তুত উত্তরাধুনিকতার সর্বজন স্বীকৃত একক কোনো তত্ত্ব নেই। কারণ এটা সব ধরনের নির্দিষ্টকরণের বিরুদ্ধে। আধুনিকতা অর্থ আমরা পশ্চিমী আধুনিকতাকে বুঝতাম।কিন্তু উত্তরাধুনিকতা এই ধারণাকে ভেঙে দিয়েছে।এর নির্দিষ্ট কোনো কেন্দ্র নেই। এছাড়া আধুনিকতা সবকিছুর মধ্যে যে আদর্শবাদ স্থাপন করেছিলো,উত্তরাধিকতা তা নিয়েও প্রশ্ন তোলে। উত্তরাধুনিকতার অন্যতম লক্ষ¥ণ হলো নির্দিষ্ট অর্থের প্রত্যাখ্যান এবং পৃথক দৃষ্টিভঙ্গির উদযাপন। অর্থাৎ এই তত্ত্বে ভাষার স্থির,বস্তুনিষ্ঠ অর্থকে অস্বীকার করা হয়।উত্তরাধুনিক কবিতায় একক ব্যাখ্যাকে প্রত্যাখ্যান করে বহুত্বকে আলিঙ্গন করা হয়।এবং এই কবিতায় নির্দিষ্ট কোনো বিষয় কেন্দ্র অথবা ভাবনা কেন্দ্রও খুঁজে পাওয়া যায়না।কবিতার অর্থ যেকোনো দিকে ছড়িয়ে পড়ার অভিমুখ খোলা থাকে। হয়তো এই কবিতার কোনো অর্থই থাকেনা।অথবা এই অর্থহীনতার মধ্যেও একটা অর্থের সন্ধান পাওয়া যায়। উত্তরাধুনিকতা পাঠক এবং পাঠের মধ্যে মিথস্ক্রিয়াকে প্রবলভাবে উৎসাহ যোগায়।
কাল বিচারে মাসুদার রহমান নব্বই দশকের কবি। শুরুতেই বলে রাখি আমি সাহিত্যের কোনো বোদ্ধা সমালোচক নই। কতিার নিচক এক পাঠক আমি। একজন পাঠকের দৃষ্টিতে মাসুদার রহমানের কবিতাকে বোঝার চেষ্টা করেছি। মাসুদারেরস্বীকৃত প্রথম বই ' হাটের কবিতা' প্রকাশিত হয় ২০১১ সালে।১৯৯৭ সালে তিনি বাংলা একাডেমির তরুণ লেখক প্রকল্প কর্মসূচির অধীনে একটি প্রশিক্ষণে অংশ গ্রহণ করেন।প্রশিক্ষণ শেষে ১৯৯৮সালে প্রকাশিত হয় তার প্রথম কাব্যগ্রন্থ 'বাঘ সমগ্র'। তবে এই কাব্যগ্রন্থকে পরবর্তীতে স্বীকৃতি দিতে তিনি রাজি হননি।নব্বইয়ের কবিতার যে আঙ্গিক এবং কাব্যভাষা,মাসুদার রহমান তাকে আত্মস্থ করেই কাব্যচর্চা শুরু করেন। কিন্তু ক্রমে তিনি তাঁর নিজস্ব কাব্যশৈলী আবিষ্কার করে নেন। এবং একটা বিষয় স্পষ্ট যে,প্রচলিত আধুনিক কাব্য আঙ্গিকে তার কবিতার ব্যাখ্যা করা কঠিন। তার অনেক কবিতায় উত্তর - আধুনিক কবিতার কলাকৌশল এবং বৈশিষ্ট্য লক্ষ্যযোগ্য ভাবে ধরা পরে।কবিতায় তিনি যেসব উপমা, চিত্রকল্প নিয়ে আসেন ,তার ব্যাখ্যাসূত্র খুঁজতে জাদুবাস্তবতা অথবা পরাবাস্তবতার আশ্রয় নিতে হয় ।বাংলাদেশের নিসর্গ-প্রকৃতি, সাধারণ গ্রামীণ জীবন - প্রবাহ গভীর মায়া এবং চিত্রময়তায় মাসুদার রহমানের কবিতায় খন্ড খন্ড ভাবে উঠে আসে।মাসুদার রহমান যে জীবন কে কবিতায় চিত্রিত করেন তা একেবারে নিখাঁদ।কারণ এইসব প্রান্তিক মানুষের সঙ্গেই তার বসবাস।যৌবনের একটা সময় কবি ঢাকা শহরে বসবাস করেছেন। কিন্তু ঢাকার সেই জীবন তাকে ধরে রাখতে পারেনি। সেই জীবন ছেড়ে তিনি নিজের গ্রামে ফিরে এসেছেন।
"শহরে ছিলাম, কয়েকটি বছর মাত্র
তারপর গাঁয়ে ফিরে গেছি
পার্কের বেঞ্চে বসা একাকী চড়ুই।"(পার্কের বেঞ্চে চড়ুই,ডায়ালের যাদু)।
কবি ইচ্ছে করলে শহরে থেকে যেতে পারতেন।কিন্তু গ্রাম থেকে শহরে আসা মানুষের জীবন সঙ্গীহীন চড়ুই পাখির মতই করুণ, নিঃসঙ্গ। কবির গ্রামে ফিরে যাওয়ার একটি বড় কারণ হলো গ্রামীণ জীবন এবং প্রকৃতির প্রতি তার গভীর মায়া। এমনকি চারপাশের বৃক্ষের প্রতিও তার প্রগাঢ ভালোবাসা।'বৃষ্টির রাতে' কবিতায় বৃক্ষের প্রতি কবির গভীর মমত্ববোধ আমাদের মুগ্ধ করে :
"ঝড় ও বৃষ্টির রাতে জানালা খুলে তাকানো;ব্যাপারটি অন্যরকম/কেবল বৃষ্টি ও অন্ধকার/হঠাৎ হঠাৎ বিদ্যুৎ চমক টর্চ জ্বালিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে/দেখো,ওই দিকে চাঁপাগাছটি ভিজে যাচ্ছে/ওইযে ওখানে জারুল ভিজে শীতে কাঁপছে তিরতির।"(বৃষ্টির রাতে, ডায়ালের যাদু)।
কবির এই মায়া শুধু বৃক্ষের প্রতিই সীমাবদ্ধ নয়।মানবিক বোধে উজ্জীবিত কবি তার চারপাশের সকল প্রাণী এমনকি মাছের মতো প্রাণীর জন্যও মায়া অনুভব করেন।তাদের যন্ত্রণাকে নিজের জীবনে উপলব্ধি করেন।
"নভেম্বরের বিকেলে রান্না হতে আসা মাছদের
চোখের দিকে তাকিয়ে শিউরে ওঠোনি?
দেখো,ওই মাছদের চোখগুলো কবির চোখের মতো কিনা? "
(মাছ,ডায়ালের যাদু)।
এখানে মাছের বিপন্নতা কবি নিজের জীবনে অনুভব করে নিজেকে মাছের সাথে একাত্ম করে দেখতে চেয়েছেন।
২০১১ সালে প্রকাশিত হয় মাসুদার রহমানের প্রথম কাব্য গ্রন্থ " হাটের কবিতা"।এই গ্রন্থে তিনি তার নিজস্ব কাব্যশৈলীর সন্ধান করেছেন। এই গ্রন্থের নাম কবিতায় কবি একটি হাটের চালচিত্রকে কেন্দ্র করে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দৃশ্যকল্পের অবতারণা করেছেন। এখানে প্রতিটি দৃশ্যই স্বতন্ত্র। কিন্তু সবটা মিলিয়ে পরিপূর্ণ একটি ছবি আমাদের সামনে ফুটে ওঠে। এই কবিতায় উত্তরাধুনিক চিত্রকল্পের প্রয়োগ দৃশ্যমান।জাদুবাস্তবতার প্রয়োগও অসাধারণ।সবমিলিয়ে এটি একটি উত্তীর্ণ কবিতা।
মানুষ কখনও কখনও কোনো কারন ছাড়াই অমূলক ভয় পায়।যেমন একসময় মানুষ ভূতের ভয় পেতো।প্রকৃতপক্ষে ভূত বলে কিছু নেই, কখনও ছিলো না।সুতরাং ভূতের ভয়ও অমূলক।তারপরও মানুষের মনোজগতে অজানা একটা ভয় থেকেই যায়।বাঘভয় কবিতায় কবি রূপকের মাধ্যমে সম্ভবতএই কথাটাই বলতে চেয়েছেন :
"কাগজের বাঘ বাতাসে নড়ছে
দেয়ালে টাঙানো বাঘের পোস্টার
সূর্য ডোবার মুখে পোড়োবাড়িটির কাছে
সত্যিকারের বাঘ করে তোলে
দাদা আমলের গাদা বন্দুক দেরাজে রয়েছে রাখা
তার সাথে জড়িয়ে রয়েছে নিকট অতীত ঘেঁষা
গ্রামময়বাঘের কাহিনী
এই বাঘ টাঙ্গানো দেয়াল থেকে লাফ দিয়ে ঘাড় মটকাবে
নির্জন বাড়িটির পাশ দিয়ে হেঁটে যেতে
ভয়
ভয় করে।" ( বাঘ ভয়,হাটের কবিতা)।
মাসুদার রহমান কবিতায় নিরীক্ষা করতে
ভালোবাসেন। আধুনিক কবিতার প্রচলিত ন্যারেটিভ এবং অর্থময়তাকে ভেঙ্গে দিয়ে তাকে ভিন্নতর এক রহস্যে তাকে সমর্পিত করেন।এবং অত্যন্ত সফলভাবে তিনি পরাবাস্তব চিত্রকল্পের মাধ্যমে ঘটনাকে দৃশ্যমান করে তোলেন। এক্ষেত্রে তার
'বাবা' কবিতাটি লক্ষনীয়:
জঙ্গলের পাশে বাড়ি। বাবা হারিয়ে গেছেন জঙ্গলে
ছেলে ও মেয়েকে নিয়ে মায়ের মুখভারি সংসার
স্কুল পড়ুয়া ছেলেটি
ড্রইং খাতায় পেন্সিলের ছবি আঁকে জঙ্গলের
এখনও স্কুলে না যাওয়া মেয়েটি
ইরেজার ঘষে ঘষে জঙ্গল ফিকে করে -
দেখে,সাইকেল চালিয়ে বাড়ি ফিরছেন বাবা।
(বাবা,ভ্যান ডগের চশমা)।
বাবা যদি জঙ্গলে হারিয়ে যায়,তাহলে তিনি কি আর ফিরে আসবেন? না আসার সম্ভাবনাই বেশি। হয়তো বাবাকে বাঘে খেয়েছে। কিন্তু আবেগ যুক্তি মানে না।স্কুল পড়ুয়া ছেলেটি ড্রইং খাতায় জঙ্গলের ছবি আঁকে।হয়তো এর মাধ্যমে সে বাবার স্মৃতিকে ধরে রাখতে চায়। স্কুলে না যাওয়া মেয়েটি সেই জঙ্গল রাবারে ঘষে ঘষে ফিকে করে জঙ্গল ফাঁকা করে যেন তার বাবার ফিরে আসতে সুবিধা হয়। ব্যতিক্রমী রূপকের প্রয়োগে অসম্ভব মানবিক স্পর্শময় একটি কবিতা, বাবা।
'একটি যুবতী লাউগাছ ' কবিতায় কবি বলছেন -
" মাচা বেঁধে দিচ্ছি লাউগাছটির জন্যে
বউ পাশে দাঁড়িয়ে লাউগাছটির এলোচুলে খোপা করে দেয়
ছোট চারাগাছটিকে বউ খুব যত্ন করে যুবতী করেছে
বউয়ের কথায় আমি ওর জন্য মাচা বেঁধে দেই
মাচা তো কেবল মাচা নয়,পালঙ্কও
এই পালঙ্কে যুবতী লাউগাছটির সঙ্গে বউ আমাকে ফুলশয্যা দেবে "
(একটি যুবতী লাউগাছ,ভ্যান গগের চশমা)।
প্রকৃতির সাথে কবির নিবিড় বন্ধনের কথা আগেই উল্লেখ করেছি। একটি যুবতী লাউ গাছের প্রতি কবি এবং তার স্ত্রীর যে মায়া এবং যে যত্ন তা সকল সীমাবদ্ধতা,সকল সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে উঠে মানবিক বোধের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে আমাদের কাছে ধরা দিয়েছে। এখানে লাউগাছ আর লাউ গাছ থাকেনি।লাউ গাছ এই নিসর্গ প্রকৃতির প্রতিভু হয়ে উঠেছে।
বিশ্ব ইতিহাসের অত্যন্ত প্রভাবশালী দুই শাসককে নিয়ে মাসুদার রহমান দুটি কবিতা লিখেছেন । কবিতা দুটি ২০১৭ সালে প্রকাশিত 'হরপ্পা':কাব্যগ্রন্থে স্থান পেয়েছে। তার একটি হলো 'চেঙ্গিস'। এই কবিতায় আমরা মহাপরাক্রমশালী মঙ্গল নেতা চেঙ্গিসকে পেঁয়াজ খেতে নিড়ানি টানতে দেখি।তাঁর ঘোড়া মাঠে ঘাস খাচ্ছে।চেংগিসের জন্য বাড়ি থেকে গামছায় বেঁধে পান্তাভাত আনা হয়েছে।টুকটুকে লাল মরিচ চটকিয়ে তিনি পান্তা ভাত খাবেন। এই ঘটনার সঙ্গে অবশ্যই বাস্তবের কোনো মিল নাই। কিন্তু কবি মাসুদার রহমান এই পরাবাস্তব উদাহরণের মাধ্যমে দেখাতে চান বহিরাঙ্গে মানুষ যতই বড় হোক, ভেতরে ভেতরে সবাই অতি সাধারণ,কারো সাথে কোনো ভেদ নাই। যেমন আকবর বাদশার সঙ্গে হরিপদ কেরানীর কোনো তফাৎ নাই।কবিতার শেষ লাইনে কবি বলেন, "তারপর ঘোড়া ছুটিয়ে কোথায় যাবেন কে জানে।" এই লাইটা আমাদের মনে করিয়ে দিলো, চেঙ্গিস খাঁর ভেতরের পরিচয় যেমন সত্য, তাঁর বাইরের পরিচয়ও উপেক্ষা করা যায় না।
একই কাব্যগ্রন্থে 'সম্রাট অশোক আসছেন' শিরোনামে এরকম আরেকটি কবিতা আছে।কবিতাটিতে দেখা যায় সম্রাট মহামতি অশোক ঘোড়ায় চড়ে ধানক্ষেতের মধ্য দিয়ে গ্রামের দিকে আসছেন। তাঁর মাথায় কোনো রাজমুকুট নাই। তার পরিবর্তে আছে সবুজ পাগড়ি। কলিঙ্গ যুদ্ধের সেই অজেয় নিষ্ঠুর সমর নায়কের হৃদয়েও বিষাদের সুর বাজে। অসাধারণের মধ্যে সাধারণের বসবাস। একটি সাধারণ গ্রামের ধান মাঠের বাস্তবতায় সম্রাট অশোককে টেনে এনে কবি মানুষে মানুষে সাম্যের বিষয়টিই বড় করে দেখাতে চেয়েছেন।
মাসুদুর রহমানের কবিতার আলাদা কিছু বৈশিষ্ট্য আছে। যেমন তার অধিকাংশ কবিতায় কোনো পূর্ণ যতিচিহ্ন থাকে না।কিন্তু এর ফলে তার কবিতার বাক্যবিন্যাসে যে অসুবিধা হয়, তাও নয়।মাসুদার কবিতায় খন্ড খন্ড চিত্র ছড়িয়ে দেন। এবং আপাত এই খন্ডিত চিত্রসমূহের মধ্যে একটা সামগ্রিকতার সন্ধান মেলে।কবি যেহেতু গ্রামে বাস করেন, সেকারণে তার কবিতার দৃশ্যকল্পে গ্রামীণ অনুষঙ্গ সাবলীলভাবে উঠে আসে। কিন্তু তার কবিতার নির্মাণে গ্রাম্যতার কোনো ছাপ নেই,এমনকি আধুনিকও নয়,বরং তা উত্তর- আধুনিক।
মাসুদার রহমান একেবারেই ক্ষুদ্র আয়তনের কিছু কবিতা লিখেছেন। যেমন :
ছোট নদী। কাগজে ব্রিজ এঁকে
ঝুলিয়ে দিয়েছি
নদী পার হয়ে এসো
(পারাপার, ভ্যান গগের চশমা)
অথবা
চা-এ পাউরুটি চুবিয়ে
চা খেতে বসেছি
আমার চা খেয়ে নিচ্ছে পাউরুটি
(টি টাইম, ঐ)।টি টাইম কবিতার অর্থময়তা নিয়ে চিন্তা করতে গিয়ে মাঝে মাঝে একটা অর্থের কথা মাথায় ঘুরপাক খায়,কিন্তু সাহস করে বলিনি কখনও ।যদিও মাত্র এগারো শব্দের কবিতায় কবি কোথাও কোনো ইঙ্গিত রেখে দেন নি। এটা আসলে ভালোবাসার কবিতা।প্রাথমিক ভালোবাসা নয়।ভালোবাসার চূড়ান্ত মূহুর্তের কথা বয়ান করেছেন কবি।
ছোট আয়তনের বেশ কিছু কবিতা আছে মাসুদার রহমানের ।এবং তার নাম উচ্চারিত হলেই সেই কবিতাগুলোর কথা চলে আসে।খন্ড,খন্ড দৃশ্যকল্প।সবমিলিয়ে একটা বক্তব্য তুলে ধরার চেষ্টা দেখা যায়। অথবা কোনো বক্তব্যই হয়তো দাঁড়ায় না শেষ পর্যন্ত। এসব কবিতার মধ্যে একধরণের রহস্যময় আবহ আছে। ফলে বিভিন্ন দৃষ্টিতে কবিতাগুলোকে ব্যাখ্যা করা যায়। হয়তো কোনো ব্যাখ্যাই কবির ভাবনার সাথে মেলেনা।অথবা সন্দেহ থাকতে পারে কবি আদৌ এসব কবিতার কোনো অর্থের কথা চিন্তা করেছিলেন কিনা।এরকম একটি কবিতার নাম ' ঘটক'।
কবিতাটাএরকম :
" বাবা ঘটক পাঠাচ্ছে, তোমার বাবা রাজি হচ্ছে না
শ্বাসরুদ্ধ দিন সব ; জেগে থাকা রাত। জানালার পাশে বসে দেখি
মধ্যরাতে-আমাদের পেয়ারাগাছ তোমাদের কামরাঙা গাছে জোনাকি পাঠাচ্ছে
তোমাদের কামরাঙা গাছ রাজি হচ্ছে না ।"
'ঘটক'কবিতাটা স্থান পেয়েছে ২০১৮ সালে প্রকাশিত "কামরাঙাগাছ রাজি হচ্ছে না" শীর্ষক কাব্যগ্রন্থে। এই দৃশ্যকল্পের মধ্যে দেখা যাচ্ছে বিয়ে সংক্রান্ত ক্লাইমেক্স মানুষ থেকে প্রকৃতির মধ্যেও সংক্রামিত হয়েছে। সাধারণ একটি বিষয় অসাধারণ অর্থময়তা ধারন করেছে।
এই পুস্তকে আরেকটি আলোচিত কবিতা আছে,'বাঘিনী'।" মাদ্রী,আমাকে বললো- 'এই পথে এসো বাবু'। কবিতার প্রথম লাইন এটা।এই মাদ্রী কে? পরবর্তীতে কবিতা পড়ে বোঝা যায় মাদ্রী জঙ্গলে বসবাস করা মুন্ডা সম্প্রদায়ের এক তরুণী।জঙ্গলের মধ্যে একটা তরুণী কোনো যুবককে যদি আহ্বান করে, ' এই পথে এসো বাবু' - কেমন রোমাঞ্চ জাগেনা মনে? গভীর জঙ্গলে পথ হারানো নবকুমারের উদ্দেশ্যে কপালকুন্ডলার সেই কণ্ঠধ্বনির মত শোনায়,'পথিক, তুমি পথ হারাইয়াছ? ' পুরো কবিতাটাই পড়ে ফেলা যাক।
'দেখছি-এ পথ কোথায়? ঘাসের জঙ্গল
মেয়েটি এগিয়ে যাচ্ছে ঘাসবন চিরে
ছোট্ট মুন্ডাপাড়া।আর ওই ঘাসবনের ওপারে ইশারার অন্ধকার
ভারি নিতম্ব পেঁচিয়ে পরেছে গ্রামীণ - চেক শাড়ি
খাটো ঝুলের ব্লাউজ।কালো পিঠের ওপরে রোদ চকচক করা
এক বাঘিনী হেঁটে যাচ্ছে ঘাসবনের ভিতর
আমার চোখ থেকে এক চিতাবাঘ
লাফিয়ে নেমে হেঁটে যেতে লাগলো মেয়েটির পিছু পিছু
'বাঘিনী'ও "কামরাঙ্গা গাছ রাজি হচ্ছে না"কাব্যগ্রন্থের কবিতা এটা।
গভীর জঙ্গলে ভারি নিতম্ব, আর খাটো ব্লাউজ পরা রোদ চকচকে উদাম কালো পিঠের কোনো নারীরুপী বাঘিনী সামনে একা-একা হেঁটে যেতে থাকলে এই পরিবেশে পেছনের পথিক যে হিংস্র চিতাবাঘ হয়ে উঠবে, এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই।
'লিভটুগেদার' মাসুদার রহমানের তুমুল জনপ্রিয় কবিতা।
"সিলভিয়া প্লাথের সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক এক ছাদের নিচে এলো
আমি আর সিলভিয়া মিলে
মাছ আড়তের পাশে বাড়িভাড়া নিয়ে আছি
সস্তায় মাছ কিনি, সহজ আমিষ খাই
আশপাশে অনেক বরফকল। আমরা প্রস্তুত আছি
আমাদের সম্পর্কের
কখনও পচন এলে; সস্তা বরফ কিনে পচন ঠেকাব"
(লিভটুগেদার, ভ্যানগগের চশমা)।
এটা খুবই সত্য কথা যে,প্রেমের সম্পর্ক বাঁচিয়ে রাখতে হলে, এমনকি সজীব রাখতেও সম্পর্কের যত্ন নিতে হয়।প্রেম কে সবকিছুর ঊর্ধ্বে স্থান না দিলে সেই প্রেমে ভাঙ্গন ধরে। দাম্পত্য জীবনে সামর্থ যেমন গুরুত্বপূর্ণ তেমনি যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবেলা করার জন্যও প্রত্তুত থাকতে হয়।
মাসুদার রহমান কবিতায় ছোট ছোট দৃশ্যকল্প নির্মান করেন বটে কিন্তু একটা অস্পষ্ঠতা রেখে দেন। তার অনেক কবিতায় উত্তরাধুনিক কবিতার লক্ষন ফুটে উঠে। এবং কবিতায় তিনি যে রুপক এবং চিত্র কল্পের অবতারণা করেন তার মধ্যে জাদুবাস্তবতা এবং পরাবাস্তবতারছায়া থাকে। সবচেয়ে বড় কথা,তার কবিতায় সহজেইএকটা নতুন স্বর সনাক্ত করা যায়। ফলে অন্যের থেকে সহজেই তার কবিতা আলাদা করা সম্ভব। কবিতার এই স্বতন্ত্র স¦রই কবিকে বাঁচিয়ে রাখে।
আনোয়ার মল্লিক
ডেপুটি পোস্টমাস্টার জেনারেল
বগুড়া বিভাগ, জলেশ্বরীতলা, বগুড়া।
মোবাইল- ০১৭১৫-৩৭৮০৭৫
