মাকিদ হায়দারের কবিতাঃ সহজিয়া জীবনের কড়চা । আনোয়ার মল্লিক
মাকিদ হায়দারের কবিতাঃ সহজিয়া জীবনের কড়চা । আনোয়ার মল্লিক

কবি হিসেবে দশক নির্ণয়ের ক্ষেত্রে মাকিদ হায়দার((জন্ম-২৮সেপ্টেম্বর,১৯৪৭খ্রি:, মৃত্যু-১০জুলাই,২০২৪ খ্রি:)এর বেলায় কিছুটা ঝামেলা হয়ে যায় তাঁর কবিতা লেখার সূচনা হয় ষাটের দশকের একেবারে শেষের দিকেকিন্তু কবি হিসেবে তাঁর  পরিচিতি এবং কিছুটা পূর্ণতা প্রাপ্তি  হয় সত্তরের  দশকে এসেঅবশ্য  এতে তাঁর কাব্য  আলাদা  কোনো বৈশিষ্ট্যমন্ডিত হয়নি দশক বিভাজন করে কবিদের শনাক্তকরণের যে রীতি প্রচলিত ,তাতে অসংখ্য কবির  ভিড়ে তাদের নাম মনে রাখার সুবিধা ছাড়া আর কি লাভ হয় তা বোধগম্য নয়তাছাড়া দশক অনুযায়ী কবিতাকে বিশ্লেষণ করার যে রেওয়াজ  চালু আছে,সেটারও আলাদা কোনো তাৎপর্য আছে  বলে মনে হয়না বাংলাদেশের পঞ্চাশ, ষাট এবং সত্তরের দশকের কাব্য ভাষায় বড় কোনো পার্থক্য নেইতবে বিষয় হিসেবে  সত্তরের  দশকের কবিতায় একাত্তরের  মুক্তিযুদ্ধ একটি নতুন মাত্রা যোগ করেছেতবে এক বা একাধিক  সাধারণ  বৈশিষ্ট্য দ্বারা এসময়ের কবিতাকে চিহ্নিত করা দুরহকিন্তু এই দুরহ কাজেই  শ্রম সময়  নিয়োজিত করা হয় মহাসমারোহে মহৎ কবিদের নিজস্ব স্বর শৈলী  থাকে;তার ভিত্তিতেই তাঁদের কবিতাকে চিনে নেওয়া যায়

 কবি হিসেবে মাকিদ  হায়দারের সার্বিক মূল্যায়ন এই লেখার উদ্দেশ্য নয়একথা সত্য,কবি হিসেবে তিনি খুব বড় নন তবে তাঁর কবিতা অন্য কারও সাথে মেলেনাসেই বিবেচনায় বলা যায়, কবিতায়  তিনি নিজস্ব একটি স্বর সৃষ্টি করতে পেরেছিলেন এই লেখায় সেই স্বরকে ধরার  প্রচেষ্টা থাকবেতাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থরোদে ভিজে বাড়ি ফেরাপ্রকাশিত হয় ১৯৭৬ সালে এরপর তাঁর আরও নয়টি কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে ,যথাঃ

আপন আঁধারে একদিন(১৯৮৩), পার্থ প্রতিম(২০০৭), কফিনের লোকটি(২০১১)  যে আমাকে দুঃখ দিলো সে যেন আজ সুখেই থাকে (২০১২), প্রিয় রোকোনালী(২০১৩), মুমুর সাথে সারা দুপুর(২০১৪),অদৃশ্য মুখগুলো(২০১৮), পাকশি লোকাল এক্সপ্রেস(২০২১) বিরহের ঘরবাড়ি(২০২২)

 মাকিদ হায়দারের কবিতায় নানা অনুভবে প্রেমের প্রসঙ্গ  এসেছেএবং  অধিকাংশ ক্ষেত্রে এই প্রেম অপ্রাপ্তির বেদনায় দীর্ন প্রেমের এই বেদনা তিনি  ভুলতে পারেননি বরং এই বেদনাকে তিনি লালন করেছেন এটা তাঁর  জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ তাঁর প্রথম কাব্যরোদে ভিজে বাড়ি ফেরা মূল সুর  অন্তর্গত বেদনাবোধ এই বেদনার প্রধান অনুষঙ্গ প্রেম প্রেমের অপূর্ণতা এবং দয়িতাকে  নিয়ে বয়ে চলা অন্তলীন   কষ্টের স্মৃতি-মেদুরতা তাঁর হৃদয়ে সৃষ্টি করে এক গভীর অন্তর্দহন

শীতের রাতেও আমি/বুকের মধ্যে লুকিয়ে অজগর/দাঁড়াই এসে তোমার আঙিনায়/বৃক্ষেরা সব দাঁড়ায় পাশাপাশি”(অমরাবতীর জন্য)

একই কবিতায় আরেক জায়গা তিনি  বলছেন,

কিংবদন্তীর ওপার থেকে বলতে থাকো কেঁদে,/ এই কি তোমার সময় হলো আসার?/লুকিয়ে আছে বুকের মাঝে গহিন পিপাসা/অন্ধকারে কোথায় যাবো বলো?পথ দেখি না/জ্বালাও দীপাবলি”( প্রাগুক্ত)

হুসনা বানুকবিতায় অপূর্ব কোমলতায়,নরম, মধুময় শব্দ ঝংকারে তিনি  বলেন,”যেভাবে যায় ধেনুর সাথে/রাখাল বালক/ প্রেমিক কানু/ রাধার খোঁজে আমি না হয়-/আমিও না হয়”(হুসনা বানু)

অপরূপ অবগুন্ঠনে কবি নিজের প্রেমের সঙ্গে রাধা এবং কৃষ্ণ-প্রেমের সাযুজ্য খুঁজেছেন এই কাব্যের নাম কবিতায়ও অনুরণিত হয়েছে বিষাদের মর্মধ্বনি জন্মমাধবকবিতায় প্রবল স্মৃতিকাতরতায় কবি প্রেমের বিষন্নতাকে  উপলব্ধি করেছেন জীবনের যাবতীয় কলরোলে পেতে চেয়েছেন প্রেমিকার মায়াবী  স্পর্শ

কিন্তু তিনি নিরাশ হয়েছেনবরং দুঃখই তাঁর জীবনে পরম সত্য হিসেবে প্রতিভাত হয়েছে  দুঃখ আমারকবিতায় তিনি বলেন-

ফুল তোলা এই জামার ভেতর,/তোমার আমার বুকের ভেতর,/দুঃখ ছিলো, দুঃখ আছে/যেমন করে আঁধার ছিলো/আদিম যুগের গুহার ভেতর/গহীন বনের সবুজ পাতার/বোঁটায় বোঁটায়”( দুঃখ আমার)

কিন্তু এই দুঃখের জন্য কারও প্রতি তাঁর  কোনো খেদ নেই, অনুযোগ নেইসকল দুঃখকে, সকল বিষাদকে তিনি নিজের মধ্যেই নিরবে ধারণ করেছেন বরং যে তাঁকে দুঃখ দিয়েছে অথবা যার জন্য তিনি যন্ত্রণায় দগ্ধ হয়েছেন,তার জন্যও  সুখের   কামনা ব্যক্ত করেছেন

যে আমাকে/দুঃখ দিলো/সে যেন আজ/সবার চেয়ে সুখেই থাকে/যে আমাকে প্রেম শেখালো/বুকের মাঝে/ অনল  দিলো,/সে যেন আজ সবার চেয়ে/সুখে থাকে/সুখেই থাকে (যে আমাকে দুঃখ দিলো সে যেন আজ সুখেই থাকে)  

অথচ প্রেমের এই বেদনা, এই যন্ত্রণা, এই বিষাদ কবির প্রত্যাশিত ছিলোনানিখাদ প্রেমের জন্য,ভালোবাসার মোহনীয় স্পর্শের জন্য তিনি দীর্ঘ অপেক্ষায় থেকেছেনতবে সেই কাঙ্খিত অপেক্ষার অবসানেও বাজেনি মিলনের সুর

অপেক্ষাও মাঝে মাঝে খুব সুন্দর মনে হয়/অপেক্ষার হাত ধরে একটি মেয়ে নিঃশব্দে এসে দাঁড়িয়েছিলো/বর্ধমান হাউসের পুরানো ভবনে/ত্রস্ত পায়ে চলে যাবো বলেই ফেরাইনি গ্রীবা/সেই জুঁই  কিংবা গোলাপের দিকে”(চিরতরে) 

প্রথম কাব্যগ্রন্থ  প্রকাশের সাত বছর পরে মাকিদ হায়দারের দ্বিতীয় কাব্য প্রকাশিত হয় তারপর দীর্ঘ চব্বিশ বছরের বিরতিঅতঃপর তৃতীয়  কাব্য  পার্থ প্রতিম

  মাকিদ হায়দারের কবিতায় একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধ   প্রবল  আবেগ, আক্ষেপ আর অভিমান নিয়ে চিত্রিত হয়েছে এবং বলা যায়  মুক্তিযুদ্ধই তাঁর কাব্য সাধনার প্রধান অন্বিষ্ট ২০১১ সালে প্রকাশিতকফিনের লোকটিকাব্যের প্রায় সবগুলো কবিতাই  মুক্তিযুদ্ধ কেন্দ্রিক

স্বদেশের মুক্তির জন্য মুক্তিযোদ্ধাগণ অসীম ত্যাগ স্বীকার করেছেনএকদিকে পাকিস্তানি শত্রু বাহিনীর সাথে তারা লড়াই করেছেন, অন্যদিকে  স্বাধীনতা বিরোধী এদেশীয় দোসরদের মোকাবেলা করতে হয়েছে সুযোগ পেলেই তারা মুক্তিযোদ্ধাদেরকে পাকবাহিনীর হাতে তুলে দিয়েছেন প্রবল প্রতিকূল অবস্থার মধ্যেও দেশকে ভালবেসে নিজের জীবন বিসর্জন দিতে তারা দ্বিধা করেননিকিন্তু মুক্ত স্বাধীন স্বদেশে সেই মুক্তিযোদ্ধাদের মৃত্যুদণ্ডাদেশ দেওয়া হয়েছেএমনকি বিনা চিকিৎসায় রোগে শোকে তারা  মৃত্যু বরণ করেছেনস্বাধীনতা বিরোধী চক্রের উল্লাস এমন পর্যায়ে চলে গেছে যে,একাত্তরে যেন এদেশে কিছুই ঘটেনি;কেউ কিছু শোনেনি, এমনকি চোখেও দেখেনিকিন্তু কবি তাঁদের অবদান কখনো ভুলে যাননি বাদল আর রিদ্দিক নামের দুই শহীদ যোদ্ধার আত্নত্যাগ এখনো কবির হৃদয়- পটে সতেজ,অমলিন

দশ বছর পরে বাদলের মায়ের সঙ্গে দেখা,/তাকে চিনেও না চেনার ভান করে/পালিয়ে আসবার সময় কে যেন  আমাকে একটি/গোলাপের পাপড়ি, ছুড়ে দিতেই মনে হলো,/আমার সমস্ত পাঞ্জাবীতে বাদল আর রিদ্দিকের/রক্ত লেগে গেলো”(আমার সিদ্ধান্ত)

২০১৩ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর ষষ্ঠ  কাব্যগ্রন্থপ্রিয় রোকোনালীএই কাব্যেও মূল সুর মুক্তিযুদ্ধএখানে গ্রন্থভুক্ত কবিতাগুলোর কোনো শিরোনাম নেইক্রমিক নম্বর দিয়ে এই গ্রন্থের সব কবিতা সাজানো   ৬১ নং কবিতায় তিনি বলেন -

এক সময় উৎসাহী বালক -বালিকারা যখন সোনার বাংলা তোমায়/ভালোবাসি বলে জাতীয় পতাকা উপরের  দিকে তুলতে লাগলো/তখন হঠাৎ অনুভব করলাম,/হাজার হাজার রক্তের ফোঁটা যেন বৃষ্টির মত এসে পড়তে  লাগলো/আমার সাদা পাঞ্জাবির উপর “(প্রিয রোকোনালী-৬১) 

মাকিদ হায়দার সরল,বর্ণনা মূলক ঢংয়ে কবিতার শরীর নির্মাণ করেছেন ছোট ছোট বাক্যে, ছন্দময় ভঙ্গিতে  তাঁর অনুভব অনুরণিত হয়েছে এসব কবিতায় অর্থের কোনো জটিলতা নেইতবে  সরল নরম  শব্দ ঝংকারে ধ্বনিত হয়েছে সমাজের নৈরাশ্য,শঠতা আর বঞ্চনার মর্মবাণীতিনি যেসব ছন্দোবদ্ধ কবিতা লিখেছেন সেই ছন্দও সাবলীল এবং গতিময়যেমন -

কোন দহনে পুড়লো/তোমার সোনার ঘর?/যতোই তারে শুধাই আমি/থাকেন তিনি নিরুত্তর/শ্রাবণ দিনের বৃষ্টি এলো/বৃষ্টি হলো চতুর্দিক,/কাহার লাগি দাঁড়িয়েছিলে/তাকিয়েছিলে নির্নিমিখ”(দহন গাঁথা)

মাকিদ হায়দার ব্যক্তিগত জীবনে সরকারি কর্মকর্তা ছিলেন চাকরি থেকে অবসর গ্রহণের পর দেশের বিভিন্ন প্রান্তে সাহিত্য-সংস্কৃতি  সংক্রান্ত বিভিন্ন  অনুসঠানে নিয়মিত অংশগ্রহণ করতেন ২০১৯ সালে তিনি কবিতায় বাংলা একাডেমি পুরস্কার লাভ করেন তাঁর কবিতায় প্রেমের যে প্রকাশ দেখি তার অন্তরালে রয়েছে না পাওয়ার চিরন্তন এক অতৃপ্তি এছাড়া মুক্তিদ্ধের আদর্শচ্যুতি তাঁকে বিপন্ন করেছে,ব্যথিত করেছে তবে এই অতৃপ্তি  এবং হতাশার মধ্যেও তিনি নতুন করে বাঁচতে চেয়েছেন,,জীবনকে নতুন করে রাঙাতে চেয়েছেন

ইচ্ছে করে হাজার বছর বেঁচে থাকি/ইচ্ছেটুকু পূরণ হলে/লিখব না আর পত্র- চিঠি/ইচ্ছে করে মেঘের সাথে ভেসে বেড়াই,/সময় পেলে রাখব ঢেকে/দহন আমার, শিউলিতলায়/পরশু রাতে ঠিক করেছি, পুড়ব না আর জোসনা- রোদে”(হাজার বছর) 

মাকিদ হায়দার দীর্ঘ সময় ব্যাপি কাব্য চর্চা করে গেছেনপত্রপত্রিকায় নিয়মিত তাঁর কবিতা ছাপা হয়েছেজীবদ্দশায় দশটি কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছিলোহয়তো তাঁর অপ্রকাশিত আরও লেখা আছেকিন্তু দুঃখজনক ব্যাপার হলো,তাঁর কবিতা নিয়ে কোথাও কোনো আলোচনা হয়নাই  এই অবহেলা তাঁর  প্রাপ্য ছিলোনা

 

আনোয়ার মল্লিক

অতিরিক্ত পোস্টমাস্টার জেনারেল

সার্কেল অফিস,নওদাপাড়া,রাজশাহী

০১৭১৫ ৩৭৮০৭৫


সাবস্ক্রাইব করুন! মেইল দ্বারা নিউজ আপডেট পান