মেঘালয়ের খাসিয়া-জৈন্তা পাহাড়ের কোল ঘেঁষে, সুনামগঞ্জের তাহিরপুর ও ধর্মপাশা উপজেলার ( একাংশ এখন পৃথক মধ্যনগর উপজেলা) বুক চিরে বিছিয়ে আছে টাঙ্গুয়ার হাওর—উত্তর-পূর্ব বাংলাদেশের এক অনন্য প্রাকৃতিক বিস্ময়। সুন্দরবনের পর দেশের দ্বিতীয় রামসার সাইট হিসেবে ১৯৯৯-২০০০ সালে ঘোষিত এই জলাভূমি সরেজমিনে ঘুরে দেখার অভিজ্ঞতা যতটা মুগ্ধ করেছে, ঠিক ততটাই ভাবিয়ে তুলেছে এর ইকোসিস্টেমের নীরব ক্ষয়। এই লেখায় নিজের ভ্রমণের অভিজ্ঞতা, হাওরপারের মানুষের জীবনযাত্রা আর পরিবেশগত বাস্তবতা—সব মিলিয়ে একটি সম্পূর্ণ চিত্র তুলে ধরার চেষ্টা করা হলো।
(বানান প্রসঙ্গে একটি কথা: অভিধানে প্রচলিত বানান ‘ হাওড়’ হলেও এই লেখায় সর্বত্র ‘হাওর’ বানানটি ব্যবহার করা হয়েছে। ধারণা করা হয়, ‘সাগর’ শব্দ থেকে ‘ সায়র’ এবং ‘ সায়র’ থেকেই ‘ হাওর’ শব্দের উৎপত্তি—এই ব্যুৎপত্তিগত যুক্তি থেকেই সচেতনভাবে ‘হাওড়’ বানান পরিহার করে ‘হাওর’ বানানটি বেছে নেওয়া হয়েছে।)
যাত্রাপথ: কোন দিক থেকে যাবেন
টাঙ্গুয়ার হাওরে ঢোকার মোটামুটি তিনটি প্রচলিত পথ আছে। সুনামগঞ্জ শহর থেকে সিএনজি বা লেগুনায় তাহিরপুর ( প্রায় ৪০ কিলোমিটার, দেড়-দুই ঘণ্টার পথ) হয়ে সেখানকার ঘাট থেকে নৌকা ভাড়া করাই সবচেয়ে বেশি প্রচলিত রুট, আর এখানেই সবচেয়ে ভালো মানের হাউজবোট ও ট্রলার পাওয়া যায়। ঢাকা-নেত্রকোনার দিক থেকে গেলে মোহনগঞ্জ হয়ে মধ্যনগর বাজার পর্যন্ত সড়কপথে গিয়ে সেখানকার ঘাট থেকে রিজার্ভ ট্রলারে হাওরে ঢুকতে হয়—এই ট্রলার-যাত্রাতেই লাগে প্রায় তিন ঘণ্টা।
আমরা অবশ্য এই দুটো পথের কোনোটাই বেছে নিইনি। যাত্রা শুরু করেছিলাম কলমাকান্দা থেকে। মধ্যনগরের সরু, ভাঙাচোরা সড়কপথে চলার যে দুর্ভোগ, তা এড়িয়ে আমাদের প্রায় এক ঘণ্টা সময় বেঁচে গিয়েছিল এই পথে। সুনামগঞ্জ-তাহিরপুর কিংবা মধ্যনগরের মতো এত সহজলভ্য নৌকা কলমাকান্দার দিকে হয়তো পাওয়া যায় না, তবে যাঁরা সময় বাঁচাতে চান আর কিছুটা রোমাঞ্চ খোঁজেন, তাঁদের জন্য এই পথটাও বিবেচনায় রাখার মতো। কলমাকান্দা থেকে নৌকায় ওয়াচ টাওয়ার পর্যন্ত পৌঁছাতে আমাদের সময় লেগেছিল প্রায় সাড়ে তিন ঘণ্টা।
যেহেতু আমরা মধ্যনগর-কলমাকান্দার দিক থেকে ঢুকেছিলাম, হাওরে পা রাখার পরপরই প্রথম যে দৃশ্যটা চোখে পড়ে, তা হলো ওয়াচ টাওয়ার আর তাকে ঘিরে থাকা জলাবন। সুনামগঞ্জ-তাহিরপুরের দিক থেকে ঢুকলে অবশ্য এই ক্রম উল্টে যায়—তখন নীলাদ্রি লেক, বারিক টিলা বা শিমুল বাগানই আগে পড়ে, আর ওয়াচ টাওয়ার পড়ে হাওরের মাঝামাঝি বা শেষের দিকে।
এত দীর্ঘ নৌকা-যাত্রার একটা বাড়তি আনন্দ হলো, বোটেই রান্নাবান্না হয়ে যায়। যা খেতে চান, তা আগেই জানিয়ে রাখলে বোটের লোকজনই সব ব্যবস্থা করে ফেলেন। আমরা সকালে খেয়েছি খিচুড়ি, এগারোটার দিকে চা-নাস্তা, দুপুরে নৌকাতেই রান্না করা সবজি-মাছ-মুরগির মাংস-ডাল, বিকেলে পায়েস আর তার কিছুক্ষণ পর আবার চা। ফেরার পথে নেত্রকোনায় থেমে খেয়েছিলাম সেখানকার বিখ্যাত বালিশ মিষ্টি আর রুটি।
প্রথম দৃশ্য: ওয়াচ টাওয়ার ও ডুবে থাকা জলাবন
তাহিরপুর উপজেলার অংশে, হাওরের ভেতরেই দাঁড়িয়ে আছে এই ওয়াচ টাওয়ার। এর ওপর থেকে তাকালে গোটা হাওরটাকে একনজরে দেখা যায়—দিগন্তবিস্তৃত জলরাশি, তার মাঝে ছোট ছোট সবুজ দ্বীপের মতো গ্রাম, আর দূরে মেঘালয়ের পাহাড়ের রেখা মিলিয়ে গেছে আকাশের সঙ্গে। আকাশ পরিষ্কার থাকলে ভারতের পাহাড়গুলোর স্তরে স্তরে সাজানো সবুজ ঢেউ স্পষ্ট দেখা যায়, আর সেই পাহাড় থেকে নেমে আসা সরু সরু জলধারা যেন রূপালি সুতোর মতো হাওরের দিকে নেমে আসছে।
টাওয়ারের চারপাশ ঘিরে আছে হিজল-করচের জলাবন, আর এই বনটাই টাঙ্গুয়ার হাওরের সবচেয়ে চমকপ্রদ বৈশিষ্ট্য। সাধারণ গাছ কয়েক দিন পানির নিচে থাকলেই মরে যায়, কিন্তু হিজল আর করচ এই নিয়মের ব্যতিক্রম। বর্ষায় হাওরের পানি বাড়লে বড় গাছগুলোর গোড়া থেকে কয়েক ফুট পর্যন্ত মাসের পর মাস পানির নিচে ডুবে থাকে, আর ছোট চারাগুলো তো পুরোপুরিই তলিয়ে যায়—তবু এরা মরে না। পানি নেমে গেলে আবার সবুজ হয়ে জেগে ওঠে, যেন কিছুই হয়নি। এই জলাবদ্ধতা সহ্য করার অসাধারণ ক্ষমতার কারণেই হিজল-করচ হয়ে উঠেছে হাওর অঞ্চলের আসল প্রাণ।
আর যদি বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ মাসে ( এপ্রিলের শেষ থেকে জুনের মাঝামাঝি) হাওরে যাওয়ার সুযোগ হয়, তাহলে দেখা মিলতে পারে হিজলের ফুলের—লালচে-মেরুন বা হালকা কমলা রঙের ঝুলন্ত থোকা থোকা ফুল, যা রাতে ফোটে আর ভোর হতেই ঝরে পড়ে পানিতে। সকালবেলা স্থির পানির ওপর ভেসে থাকা এই ফুলের গালিচা দেখলে মনে হয় প্রকৃতি নিজেই যেন একরাতে বিছানা পেতে রেখেছে। এমন দৃশ্য একবার দেখলে দীর্ঘদিন মনে গেঁথে থাকে।
নীলাদ্রি লেক: পাহাড়ের কোলে নীল জলরাশি
তাহিরপুরের টেকেরঘাট এলাকায় একসময় ছিল চুনাপাথরের খনি। খনির কাজ বন্ধ হওয়ার পর সেই গর্তে জমে থাকা পানি রূপ নিয়েছে অপূর্ব নীল রঙের এক লেকে—শহীদ সিরাজ লেক নামে পরিচিত হলেও পর্যটকদের মুখে মুখে এটি এখন নীলাদ্রি লেক। লেকের ঠিক পেছনেই মেঘালয়ের পাহাড় এমনভাবে উঁচু হয়ে দাঁড়িয়ে আছে যে মনে হয় হাত বাড়ালেই ছোঁয়া যাবে। পানির রং আর পাহাড়ের সবুজের বৈপরীত্য এতটাই নাটকীয় যে অনেকে একে ‘বাংলার কাশ্মীর’ নামেও ডাকেন। বিকেলের নরম আলোয় পাহাড়ের ছায়া যখন লেকের পানিতে পড়ে, তখনকার দৃশ্যটা ক্যামেরায় ধরে রাখার লোভ সামলানো কঠিন।
লাকমাছড়া: পাহাড়ি ছড়ার নির্জন সৌন্দর্য
তাহিরপুরের দক্ষিণ শ্রীপুর ইউনিয়নের লাকমা গ্রামের গা ঘেঁষে মেঘালয় পাহাড় থেকে নেমে এসেছে একটি পাথুরে ছড়া—লাকমাছড়া। পুরো এলাকাটা যেন ছোট-বড় নুড়িপাথরে মোড়া; পাহাড়ের ঢাল বেয়ে নেমে আসা স্বচ্ছ পানি পাথরের ফাঁক দিয়ে বয়ে গিয়ে মিশেছে পাটলাই নদীতে, আর সেই নদীই শেষমেশ যুক্ত হয়েছে হাওরের সঙ্গে। জায়গাটায় ভিড় কম, শব্দও কম—আছে শুধু পানির কলকল শব্দ আর দূরের পাহাড় থেকে ভেসে আসা মেঘের ছায়া। যাঁরা জনারণ্য এড়িয়ে একান্ত নিরিবিলিতে প্রকৃতি উপভোগ করতে চান, লাকমাছড়া তাঁদের জন্য আদর্শ জায়গা।
বারিক টিলা: যাদুকাটার তীরে মেঘ-পাহাড়ের মিতালি
যাদুকাটা নদীর তীর ঘেঁষে তাহিরপুরে দাঁড়িয়ে আছে বারিক টিলা (স্থানীয়ভাবে বারেক টিলা বা বারিক্কা টিলা নামেও পরিচিত)। এই উঁচু টিলার একদিকে নদী, অন্যদিকে সরাসরি বাংলাদেশ-মেঘালয় সীমান্ত। টিলার ওপর উঠে দাঁড়ালে একসাথে তিনটি দৃশ্য চোখে পড়ে—নিচে যাদুকাটার স্বচ্ছ পানিতে বালুচরের ঝিলিক, সামনে মেঘালয়ের সারি সারি পাহাড়, আর সেই পাহাড়ের গা বেয়ে নেমে আসা সাদা জলধারা যা বৃষ্টির পর আরও প্রকট হয়ে ওঠে। পর্যটকদের সুবিধার্থে এখানে সম্প্রতি নতুন একটি ভিউপয়েন্ট ও ওয়াচ টাওয়ারও তৈরি করা হয়েছে।
শিমুল বাগান: বসন্তের রক্তিম উৎসব
বারিক টিলা থেকে খুব দূরে নয়, যাদুকাটা নদীর কাছেই তাহিরপুরের মানিগাঁও গ্রামে গড়ে উঠেছে দেশের বৃহত্তম শিমুল বাগান। বাগানের প্রবেশপথে একটি সাইনবোর্ডে লেখা চোখে পড়ল—“এশিয়ার বৃহত্তম শিমুল বন”। সারি সারি শিমুল গাছ বসন্তে রক্তলাল ফুলে ছেয়ে গেলে পুরো এলাকাটা যেন আগুন রঙে রাঙা হয়ে ওঠে—ছবি তোলার জন্য এই সময়টাই সবচেয়ে জনপ্রিয়। অন্য ঋতুতে গেলেও অবশ্য ক্ষতি নেই; ঘন সবুজ পাতার ছায়ায় হাঁটাহাঁটি আর পাশের যাদুকাটার দৃশ্যও কম আকর্ষণীয় নয়।
রাজাই ঝর্ণা: সীমান্তের গায়ে আরেকটি জলপ্রপাত
তাহিরপুরের সীমান্তবর্তী পাহাড়ি এলাকায়, লালঘাট ঝর্ণার কাছাকাছি অবস্থান রাজাই ঝর্ণার। লাকমাছড়ার তুলনায় কম পরিচিত হলেও মেঘালয়ের পাহাড় থেকে নেমে আসা এই জলপ্রপাতের নিজস্ব একটা আকর্ষণ আছে—পাথুরে খাঁজ বেয়ে নেমে আসা পানির ধারা আর চারপাশের নির্জনতা মিলিয়ে জায়গাটা এখনও পর্যটকদের ভিড়ের বাইরে, যা একে করে তুলেছে আরও বেশি প্রাকৃতিক ও অনাবিল।
হাওরের প্রাণ: মাছ, পাখি আর বিলে মাছ ধরার উৎসব
টাঙ্গুয়ার হাওরকে বলা হয় ‘মাদার ফিশারি’—এখানেই প্রজনন করে প্রায় ১৪০ প্রজাতির মাছ, যার মধ্যে আছে আইড়, গাং মাগুর, বাইম, তারা বাইম, গুতুম, গুলশা, টেংরা, তিতনা, গরিয়া, বেতি, কাকিয়ার মতো নাম। বর্ষা শেষে পানি নামতে শুরু করলে বা শীতের শুরুতে হাওরের ছোট ছোট বিলগুলোয় শুরু হয় মাছ ধরার এক সাড়া জাগানো উৎসব—আশপাশের গ্রাম থেকে দলে দলে মানুষ জাল, পলো আর হাতে বানানো নানা ফাঁদ নিয়ে নেমে পড়ে পানিতে। এই মৌসুমি উৎসবই হাওরপারের মানুষের বছরের অন্যতম বড় সামাজিক আয়োজন—হইহুল্লোড়, প্রতিযোগিতা আর টাটকা মাছের ভাগাভাগি মিলিয়ে এক অন্যরকম আনন্দের দিন।
পাখির দিক থেকেও হাওর কম সমৃদ্ধ নয়। ২০১১ সালের এক শুমারিতে হাওরের বিভিন্ন বিল মিলিয়ে ৪৭ প্রজাতির দেশি জলচর পাখির ২৮ হাজারেরও বেশি সংখ্যা গণনা করা হয়েছিল। শীত এলে এখানে যোগ হয় প্রায় ২৫০ প্রজাতির পরিযায়ী বা অতিথি পাখি—দূর দেশ থেকে উড়ে আসা এই পাখির ঝাঁক শীতের সকালে হাওরের আকাশকে করে তোলে জীবন্ত। এ ছাড়া হাওরে আছে ৬ প্রজাতির স্তন্যপায়ী প্রাণী, ২০ প্রজাতির সাপ, ৪ প্রজাতির কচ্ছপ, ৭ প্রজাতির গিরগিটি আর ১২ প্রজাতির ব্যাঙ, যার মধ্যে দুর্লভ মার্বেল কুনো ব্যাঙও আছে।
তবে এই সমৃদ্ধ ভাণ্ডারও ক্রমশ ক্ষয়িষ্ণু। হলুদ কাছিম, কড়ি কাইট্টা ও পুরা কাইট্টার মতো কচ্ছপ প্রজাতি ইতিমধ্যে বিলুপ্তপ্রায় বা বিলুপ্ত হয়ে গেছে—আমাদের পুরো ভ্রমণে এই প্রাণীগুলোর একটিও চোখে পড়েনি। নৌকার মাঝিমাল্লাদের কাছে মাছের কথা জিজ্ঞেস করতেই তাঁরা জানালেন, এখন সোনার দামেও হাওরের আসল মাছ পাওয়া কঠিন—নানা জায়গায় খুঁজেও আগের মতো মাছ মেলে না। অনেক পর্যটক হাওরের মাছ খেতে চেয়ে প্রতারিতও হন; তাঁদের চাষের মাছকেই হাওরের মাছ বলে খাওয়ানো হয়। তাই ভ্রমণে গিয়ে সাধারণ মাছ বা স্থানীয় হাঁসের মাংস খাবারে রাখাই বরং নিরাপদ ও বাস্তবসম্মত। নিষিদ্ধ চায়না দুয়ারি ও কারেন্ট জালে পোনামাছ নির্বিচারে ধ্বংস হওয়ায় সামগ্রিক মাছের প্রাচুর্য কমছে, আর ইঞ্জিনচালিত নৌকার শব্দদূষণ ও প্রজনন-এলাকা ধ্বংসের কারণে পাখির সংখ্যাও আগের তুলনায় অনেক কমে এসেছে।
হাওরপারের মানুষের জীবনযাত্রা: ঋতুর সাথে বাঁধা এক জীবন
টাঙ্গুয়ার হাওরে ঘুরতে ঘুরতে যে জিনিসটা সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ে, তা হলো প্রায় প্রতিটি বাড়ির পাশেই বাঁধা আছে একটি করে নৌকা। এখানকার মানুষের জীবন পুরোপুরি ঋতুর হাতে বাঁধা। বর্ষায় যখন হাওর থইথই পানিতে ভরে ওঠে, তখন যাতায়াত সবচেয়ে সহজ—নৌকাই তখন একমাত্র বাহন, ঘরে ঘরে নৌকা নিয়ে ছুটে চলা মানুষ দেখে মনে হয় গোটা এলাকাটাই যেন এক ভাসমান জনপদ। কিন্তু শীত এলেই ছবিটা পুরো উল্টে যায়—পানি নেমে যাওয়ায় নৌকা চলাচল কঠিন হয়ে পড়ে, বহু জায়গায় নৌকা একরকম অচল হয়েই বাঁধা থাকে, আর মানুষকে হাঁটাপথে বা কাদা মাড়িয়ে চলাচল করতে হয়।
বিলের বাইরের জমি শীতে শুকিয়ে গেলে সেখানে শুরু হয় ধান চাষ—আর এই একটি ফসলই হাওরপারের অধিকাংশ মানুষের সারা বছরের একমাত্র অর্থনৈতিক ভরসা। কিন্তু এই ভরসাও প্রতি বছর নিরাপদ নয়। কোনো কোনো বছর আগাম বর্ষা বা পাহাড়ি ঢলে ধান পাকার আগেই জমি তলিয়ে যায়, আর তখন কৃষকের মুখের হাসি নিভে যায় এক লহমায়—একটি মাত্র ফসলের ওপর নির্ভরশীল একটি জনগোষ্ঠীর জন্য এই ক্ষতি মানে পুরো বছরের অনিশ্চয়তা।
বর্ষায় যখন মাঠে তেমন কাজ থাকে না, তখন হাওরপারের মানুষের সামনে খুলে যায় অবসরের এক ভিন্ন জগৎ। নৌকায় বসে বা বাড়ির উঠানে জড়ো হয়ে আড্ডা দেওয়া, আর সেই আড্ডাতেই বেঁচে থাকে হাওর অঞ্চলের নিজস্ব লোকগানের ঐতিহ্য। এই মাটি থেকেই উঠে এসেছেন বাংলা লোকসংগীতের কিছু কিংবদন্তি সাধক-গীতিকার।
সুনামগঞ্জের হাওর অঞ্চলের সবচেয়ে প্রভাবশালী নাম মরমি কবি হাছন রাজা—তাঁর রচনা ও সুর এই অঞ্চলের লোকায়ত চেতনার প্রাণ হয়ে আছে। তাহিরপুরের কাছেই উজানধল গ্রামে জীবন কাটানো বাউল সম্রাট শাহ আবদুল করিম-এর গানে টাঙ্গুয়ার হাওরের প্রকৃতি, মানুষের জীবনসংগ্রাম আর মরমি ভাবধারা জীবন্ত হয়ে উঠেছে। এ ছাড়া এই অঞ্চলেরই আরও দুই খ্যাতিমান বাউল-সাধক হলেন কামাল পাশা (কামাল উদ্দিন) এবং মারফতি গানের রচয়িতা দূরবীন শাহ। ধামাইল গানের প্রবর্তক ও বৈষ্ণব কবি রাধারমণ দত্ত এবং জনপ্রিয় মরমি গীতিকার গিয়াস উদ্দিন-ও এই লোকায়ত ঐতিহ্যেরই অংশ। এঁদের হাত ধরেই তৈরি হয়েছে ‘গাড়ি চলে না’, ‘ বন্দে মায়া লাগাইছে’, ‘ঝিলমিল ঝিলমিল করে রে ময়ূরপঙ্খী নাও’, ‘আগে কী সুন্দর দিন কাটাইতাম’ ( শাহ আবদুল করিম), ‘গুডি উড়াইল মোরে’, ‘ সোনা বন্ধে আমারে দেওয়ানা বানাইলো’ (হাছন রাজা) কিংবা ‘ভোমর কইয়ো গিয়া’ ( রাধারমণ)-এর মতো কালজয়ী গান, যেগুলো আজও হাওরপারের ঘরে ঘরে গীত হয়।
গানের পাশাপাশি হাওর অঞ্চলের নিজস্ব কিছু পরিবেশনরীতিও আছে—নারীদের পরিবেশিত ঐতিহ্যবাহী লোকনৃত্য-গীত ধামাইল, বর্ষায় মাঝি-মাল্লাদের সম্মিলিত কণ্ঠে গাওয়া উদ্দীপনামূলক নৌকাবাইচ ও সারিগান, আর প্রাচীন পরিবেশনরীতি ঘাটু গান। উল্লেখ্য, বারী সিদ্দিকী ও ফজলুর রহমান বাবুর মতো পরবর্তী প্রজন্মের যে শিল্পীদের কণ্ঠে হাওরাঞ্চলের গান দেশজুড়ে জনপ্রিয় হয়েছে, তাঁরা মূলত টাঙ্গুয়ার হাওর নয়, বরং নেত্রকোনার হাওর অঞ্চলের প্রতিনিধি—তবু বৃহত্তর হাওর-সংস্কৃতির একই ধারার অংশ হিসেবে তাঁদের নামও এখানে স্মরণীয়। বর্ষার ভরা হাওরে নৌকার ওপর বসে দূর থেকে ভেসে আসা এমন কোনো চিরচেনা সুর কানে এলে বোঝা যায়, কেন এই অঞ্চলকে বলা হয় গানের দেশ।
বনাঞ্চল ক্ষয় ও উদ্ভিজ্জ সুরক্ষার অভাব
হাওরের প্রাণ হিজল-করচের বনের সহনশীলতা যতই অসাধারণ হোক, তার সুরক্ষা নিশ্চিত করার কোনো ব্যবস্থা এখানে নেই। ওয়াচ টাওয়ার সংলগ্ন এলাকা ও আশপাশের অংশে বহু পুরোনো গাছের ডালপালা কেটে ফেলা হয়েছে; মৃত বা কাটা গাছের শিকড় ও পানির নিচে থাকা গোড়ালি দেখেই বোঝা যায় কতটা গাছ কাটা হয়েছে। ওয়াচ টাওয়ার এলাকায় ছোট নৌকায় হিজল-করচ গাছের নিচ দিয়ে যাওয়ার সময় পায়ে বেধেছিল পানির নিচে ডুবে থাকা কাটা গাছের গোড়ালি—নিজের চোখেই দেখা এই অভিজ্ঞতা বলে দেয়, ক্ষতিটা কতটা বাস্তব। উদ্বেগের বড় কারণ—নতুন চারার অনুপস্থিতি। অনিয়ন্ত্রিত পর্যটন, গবাদিপশুর অবাধ বিচরণ কিংবা স্থানীয়দের হস্তক্ষেপে উঠতি গাছগুলো ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। বয়স্ক গাছগুলোর জীবনকাল ফুরোলে গোটা হাওর বৃক্ষশূন্য হয়ে পড়ার চরম ঝুঁকিতে আছে।
পর্যটনকেন্দ্র ও অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা
হাঁটার পথ ও সংযোগ সড়ক: নৌকা থেকে নেমে টেকেরঘাট, বারিক টিলা ও শিমুল বাগানে যাওয়ার রাস্তার অবস্থা অত্যন্ত নাজুক। কম খরচে দৃষ্টিনন্দন ও পরিবেশবান্ধব ওয়াকওয়ে নির্মাণ করলে পর্যটকের অভিজ্ঞতা যেমন আনন্দদায়ক হবে, তেমনি পরিবেশও সুরক্ষিত থাকবে।
শিমুল বাগান: বর্তমানে ৫০ টাকার টিকিট থেকে যে তহবিল সংগৃহীত হয়, তা এই বিশাল বাগান রক্ষায় অপ্রতুল। সরকারি অর্থায়ন ও সমন্বিত উদ্যোগে বাগানের চারপাশে সৌন্দর্যবর্ধক লতা ও ঝোপজাতীয় গাছের বেষ্টনী তৈরি করলে শিমুল বাগান আরও সুন্দর দেখাবে।
বারিক টিলা ও লাকমাছড়া: নদীভাঙন ও অনিয়ন্ত্রিতভাবে পাহাড় কাটার কারণে বারিক টিলা প্রায় বৃক্ষশূন্য। পরিকল্পিত বনায়নের মাধ্যমে সেখানে বন গড়ে তোলা সম্ভব, আর লাকমাছড়ার পাথর উত্তোলন নীতিমালার আওতায় এনে এর প্রাকৃতিক সৌন্দর্য রক্ষা করা দরকার।
থাকা-খাওয়ার সংকট: বর্ষা-শরৎকালে হাজারো পর্যটক এলেও শুষ্ক মৌসুমে সড়ক-সংযোগের অভাবে দর্শনার্থী কমে যায়। টেকেরঘাটে হাতে গোনা কয়েকটি থাকার ব্যবস্থা থাকলেও তা চাহিদার তুলনায় অপ্রতুল—অথচ হাওরপারের মানুষের আর্থসামাজিক ভাগ্য বদলের সবচেয়ে বড় সম্ভাবনা লুকিয়ে আছে সুপরিকল্পিত পর্যটনেই।
উত্তরণের পথ: সুপারিশমালা
১. কমিউনিটি ফরেস্ট্রি: স্থানীয় বাসিন্দাদের সম্পৃক্ত করে ‘ হাওর রক্ষা সমিতি’ বা এলাকাভিত্তিক ব্যবস্থাপনা কমিটি গঠন করতে হবে। প্রতিটি নতুন চারা সুরক্ষায় নির্দিষ্ট ভাতা বা লভ্যাংশের ব্যবস্থা করলে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি সফল হবে।
২. জোনভিত্তিক নৌকা চলাচল: পর্যটকবাহী নৌকার জন্য সুনির্দিষ্ট রুট নির্ধারণ এবং পাখি, মাছ ও অন্যান্য প্রাণী-সমৃদ্ধ এলাকায় সাউন্ড রেস্ট্রিকশন বা ইঞ্জিন বন্ধ রাখার নিয়ম চালু করা।
৩. আইন প্রয়োগ ও কঠোর নজরদারি: নিষিদ্ধ চায়না দুয়ারি জাল সম্পূর্ণ বাজেয়াপ্ত করা এবং মাছের প্রজনন মৌসুমে অভয়াশ্রমগুলোতে মাছ ধরা কঠোরভাবে বন্ধ রাখা।
৪. পরিবেশবান্ধব অবকাঠামো: বাংলাদেশ পর্যটন কর্পোরেশন ও পরিবেশ অধিদপ্তরের যৌথ উদ্যোগে হাওরের প্রাকৃতিক ভারসাম্য বজায় রেখে টেকসই পর্যটন (ইকোট্যুরিজম) মডেল চালু করা, যেখানে থাকবে প্লাস্টিক ব্যবহারে কঠোর নিষেধাজ্ঞা ও পর্যটকদের জন্য সুনির্দিষ্ট আচরণবিধি।
৫. আর্থসামাজিক অন্তর্ভুক্তি: হাওরপারের মানুষের জীবিকা টেকসই পর্যটন ও মৎস্যচাষের সাথে যুক্ত না করা গেলে সম্পদ রক্ষার যেকোনো উদ্যোগই দীর্ঘমেয়াদে ব্যর্থ হবে। যে মানুষগুলো প্রতিদিন এই হাওরের কোলে ঘুম ভাঙে, তারাই হতে পারে হাওর রক্ষার সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য প্রহরী।
শেষকথা
টাঙ্গুয়ার হাওর কেবল একটি প্রাকৃতিক দৃশ্যপট নয়—এটি একটি জীবন্ত বাস্তুতন্ত্র, যেখানে মাছ, পাখি, উদ্ভিদ আর মানুষের জীবিকা একসূত্রে গাঁথা। বর্ষায় থইথই জলরাশি আর শীতের শুকনো মাঠ—এই দুই বিপরীত রূপের মাঝেই বেঁচে থাকে হাওরপারের মানুষের সংগ্রাম, গান আর আশা। এই ভারসাম্য রক্ষা করতে না পারলে সোনা-হীরার চেয়েও মূল্যবান এই সম্পদ একদিন কেবল ইতিহাসের পাতায় থেকে যাবে। এখনই সময় সমন্বিত, বিজ্ঞানভিত্তিক ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণমূলক ব্যবস্থাপনার।
তথ্যসূত্র: ব্যক্তিগত ভ্রমণ অভিজ্ঞতা, বাংলাপিডিয়া, উইকিপিডিয়া ( টাঙ্গুয়ার হাওর, তাহিরপুর উপজেলা, হিজল), এবং হাওর-বিষয়ক বিভিন্ন প্রতিবেদন ও ভ্রমণ গাইড।
