রজব বকশীর কবিতা 
রজব বকশীর কবিতা 

Π ফিরে আসে কথা 

কথা দাঁড়ায়, কথা হারায়;ফিরে আসে কথা
কেননা কথায় যে আগুন আছে, আলো হয়; ছড়িয়ে পড়ে 
এমন শব্দে ও নিঃশব্দে তুমি হাসো, তুমি কাঁদো

আমি কি ছিলাম না?
দূর ও নৈকট্য ঢেউ খেলে যায় 

আমিও তো রোদ বৃষ্টি আঁধারের পথ ধরে হাঁটি  


Πএকটি ভ্রমণের ইতিবৃত্ত 

ভিড়ে একা, পাঁচ আঙুলে মুঠি
ধরি দেহ ভূগোল 
এবং অনুভবের বরফ ও উষ্ণতায় ডুবি ভাসি  
দূরে থেকেও সান্নিধ্যের আবহ 
প্রেম ও বিরহ যাপন
যেভাবে শূন্যের আলো ও জল 
মাটিতে নেমে আসে
শিশিরে সমুদ্রের কণা
সেভাবেই আমাদের বুঝাপড়া জীবনের 
ক্ষয়িষ্ণু দেহ
রুহের স্পর্শে বাঁচা
এরি নাম প্রেমমধু
নচেৎ ঘৃণার বিষ পান...

দুঃস্বপ্নের আঁধার পেরোনোই যাপিত সূর্যগান 
যেখানে ভালোবাসার নাম স্বপ্নফুল
ফোটে আর ঝরে যায় 


Π জীবনচক্র 

আমরা তিনজন ভোরের আলোয় একজন হয়ে জেগে উঠি
আধমরা শিশিরে জড়ানো ঘাসের আহ্বান শুনি
তারপর হাঁটি অস্থির দুপুর আর মলিন বিকেলের দিকে

আমরা জীবনচক্রের লাটিমে ঘুরে যাই
সিসিফাসের পাথর গড়িয়ে পড়ে ঠিক চূড়ার আগেই

ক্ষুধা ও তৃষ্ণার টানে 
আমি চলে যাই পূর্ব দিগন্তে
তুমি উত্তর মেরুতে
সে -দক্ষিণ প্রান্তে

তবু ফিরে এসে আবার এক হই
পশ্চিমে ঢলে পড়া সূর্য অপেক্ষা করে আমাদের আলিঙ্গনের



Π কোথাও যাইনি 

কোথাও যাইনি তবু যাওয়া হয়ে গেছে
কোথাও তুষারঝড়, কোথাও মরুভূমি, কোথাও পাহাড়
সমতল সবুজ ভেদ করে হাঁটি সময়ের স্রোতে

ভেতরে এক অদম্য যাত্রী সমুদ্র তৃষ্ণায় জ্বলে
জন্মজুড়ে পুড়ে উঠে এসেছি
প্রেম ও দ্রোহে উড়ন্ত ফিনিক্সের মতো
কালিদাসের মেঘমেদুর হয়ে নেমে আসে নৈঃশব্দ্য

আঁধার আমাকে ডাকে,
অক্ষর আর প্রকৃতির ছায়া ফেলে যায় এই যাত্রায়

ইবনে বতুতা জানত জীবন এক প্রশ্নবোধক চিহ্ন,
আমি জেনেছি আত্মসংযোগ মানে চিরন্তন স্টেশনে একা দাঁড়িয়ে থাকা



Π রূপান্তর 

বিকেলের মরা রোদ হাঁটছে ফুটপাত ধরে
শহর হঠাৎ থেমে যায় 
আবার ছুটে চলে 
ডকুমেন্টারির দৃশ্যের মতো

একটি বাঘ হিংস্রতায় হরিণকে আক্রমণ করে
আর মুহূর্তে রক্তে পিচঢালা পথ নদী হয়ে ওঠে
এই শহরের জান বা যান কিছুই নয়
ভ্যানগগের ক্যানভাসের মতো স্থির

এ এক ব্রুটাসীয় ছায়া 
সিসিটিভি ফুটেজেও কারও কোন চিৎকার নেই!
তবু সন্ধ্যে হলেই
এই শহর আলোকসজ্জায় আফ্রোদিতি হয়ে ওঠে


Π মাথার হাটে 

কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছি, নিজেই জানি না
সকাল এসে চোখে আঙুল রাখে,
বলে: দেখো, হাঁটছে মানুষ...
তাদের মাথা কোথায়?

গমগম হাটে সারি সারি মাথার সারি,বেচাকেনার ধুম, 
হাতে ধরা চিন্তা;ঘামছে কপাল, হাঁকডাক জারি 
নিজের মাথাটাও উঠেছে নিলামে,
ঘুমের ভেতরেই দাম হাঁকা চলছিল চুপিচুপি

বউ ডেকে তোলে, চোখে বিরক্তির আগুন,
তুমি কি সারাজীবন আমার মাথাই খাবে?
আমি চুপ, যেন উত্তর আমার নয়;
সম্ভবত ঘুমের হাট থেকেই
তোমার মাথাটাই কিনে এনেছি!

তবু আজকাল জাগ্রত হাটেও নিজের মাথার ছায়া খুঁজে ফিরি,হাত বাড়িয়ে দেখি শূন্য মাথা!
চিন্তার ওজনহীন এক সময়ের ভেতর
আমারই মুখ অথচ আমারই নয়


Π ভিশন 

ঠিক কোথায় দাঁড়িয়েছিলাম, মনে পড়ে না
আয়নার সামনে, না কি তার প্রতিচ্ছবির পেছনে?
একটি কুয়াশাভেজা ক্যানভাস, এখনো ঝুলে আছে মগজে 

যেখানে দাঁড়িয়েছি,অজান্তে কানে আসে ক্রিং ক্রিং কোনো ভেসে আসা শব্দ,
একজন সাইকেল আরোহী বলে ওঠে হঠাৎ,
তার সাইকেলে তিন চাকা
তবে একটাতে সে নিজেই ঘোরে,
বাকি দুটো শুধু থাকে চোখ বুজে 

আর আমি?অন্ধের ছড়ি হাতে এগোই এক অলীক দিগন্তের দিকে,
যার দিকে যাবার কোনো মানচিত্র নেই
শুধু গমন, শুধুই গমন 




Π বরফে আলো লিখে যাই 

বরফের চাঁই ভেদ করে বৈদ্যুতিক দৃষ্টি
অন্যরকম দেখার ইঙ্গিত ছড়িয়ে দেয়
নীরব কষ্টফুল পরাগ ছড়ায়
এই দহনময় যাপনের শিল্পে প্রস্ফুটন ঘটে
প্রেম কি কেবল দেহ ছোঁয়ার নাম?
নাকি মনের গভীরতম কোণ ছুঁয়ে যাওয়া?
এইসব পাঠ নয়, অনুভবের দিগন্তেই পা রাখি
তুমি যা বলো না, সেই অনুচ্চারিত স্পর্শই
রয়ে যায় সাদা পাতায় পাতায়
জীবন ও মৃত্যুর মাঝখানে এতটুকু প্রেম
তার চেয়ে গভীর বিরহ নিয়ে সামনে এগিয়ে যাই

এই খাঁচা হাঁড়-মাংস-রক্ত-মাটির খাদ্য হলেও
মন তার বাইরে অপচয়হীন 
অমরত্বের বীজ নামে কিছু নেই
আছে শুধু ক্ষয়িষ্ণু সময়ের ঢেউ, বারবার ফিরে আসে

বরফে পা রাখার আগেই আলো লিখে যাই
আমরা আগুন ও জলের ভিতর দিয়ে হেঁটে যাই
যতক্ষণ না ফুরিয়ে যায় আমাদের নিঃশ্বাস



Π সেই সূত্রে কত অসূত্রের বাঁকমোড় 

এরপরও ঘটে, অঘটন পটীয়সী 
নানা কথা উপকথার ডালে পাতায় পাতায় 
তীব্র বাতাসের আগে 

আমরা কত বাঁকা রাস্তা পাড়ি দিই
কিছু বলার জন্য, না বলেও
এবং শোনার জন্য 
উদগ্রীব 

সেই সূত্রে কত অসূত্রের বাঁকমোড়
ঘরদোর থেকে নক্ষত্র অবধি 
সবিস্তার

ওরা জেগে আছে
নাকি ঘুমিয়ে জাগার নাটক করে
গভীরতা ডুবে ভেসে দেখে কেউ কেউ 

আমরা কত কি করি বা না করি
কত কিছু কাছে থেকেও দূরের হয়ে ওঠে 
কত কিছু মনের বিরুদ্ধে দাঁড়ায় 
নিষিদ্ধ গন্দমে আসক্ত হই

আমরা সন্দেহের ভেতর দিয়ে হেঁটে যাই
ভাসি উড়ি নিরন্তর 

প্রকৃত ঘটনার আশপাশে ঘুরে বেড়ায় 
রঙ বেরঙের মুখ ও মুখোশ 
তার কতটা চিহ্নিত ও অচিহ্নিত লেখাজোখা নেই 



Π ব্যর্থতার দায় কাঁধে তুলে হাঁটি 

না ভিজে সাঁতরে বেড়ায় শরীর ও মন
সেই শরীর নৌকা,ধ্যানস্থ মন
শব্দ ও নিঃশব্দে নিজেকে পুড়িয়ে আলো দিয়ে যাই
উড়ে কর্ম ধর্মে ধোঁয়া পোড়ায় দেহ, মাটি খায়

এই শরীর,এই মন 
ভবে অনুভবে কতটা আমাদের হয়ে ওঠে? 



জীবন বৃত্তান্ত :

রজব বকশীর জন্ম ১ অক্টোবর ১৯৬৫,  বকশীগঞ্জ, জামালপুর।  পিতা হায়দার আলী ও মাতা অজিফা খাতুন। আশির দশক থেকে লেখালেখি করেন দেশ বিদেশের বিভিন্ন ম্যাগাজিন,পোর্টাল, ই- পত্রিকা,  সাপ্তাহিক, পাক্ষিক ও জাতীয় দৈনিক পত্রিকায়।

প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ :
১.ধূসর এলবাম (রহমান প্রেস, ১৯৯৬)।
২.উদ্ধত আঁধার (কালিদাস,২০০৯)। 
৩.যে হাতে পায়রা ওড়ে (গতিধারা,২০২৩)।
৪.সেইসব দরজা জানালা জেগে ওঠে (গতিধারা,২০২৩)।
৫.ছায়াসঙ্গী মায়াসঙ্গী(বইপত্র,২০২৪)।
৬.তৃষ্ণার ধ্বনি প্রতিধ্বনি (বইপত্র,২০২৪)। 

ছড়াগ্রন্থ :
১.ডুমুর ফুলের মউ (রহমান প্রেস ,১৯৯৭)

গবেষণা গ্রন্থ :
১.জামালপুর জেলার মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ( গতিধারা,২০০৯)।
২.জামালপুর জেলার ইতিহাস (গতিধারা,২০১২)।

সমন্বয়ক : 
বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধ জ্ঞানকোষ গ্রন্থমালা                             জামালপুর (২০২০),এশিয়াটিক সোসাইটি,ঢাকা।

সংগ্রাহক: 
বাংলাদেশের লোকসংস্কৃতি গ্রন্থমালা
জামালপুর (২০১৩),বাংলা একাডেমি,ঢাকা। 

গীতিকার : 
বাংলাদেশ টেলিভিশন (২০০৯)।
বাংলাদেশ বেতার ( ২০১১)।

সম্পাদিত পত্রিকা : 
আরশি 

পুরস্কার :
১.বকশীগঞ্জ সাহিত্য পরিষদ সম্মাননা (২০১১)
২.মুক্তির রং ভালোবাসি জামালপুর সম্মাননা ( ২০১৭)

সাবস্ক্রাইব করুন! মেইল দ্বারা নিউজ আপডেট পান