মলয় রায়চৌধুরী'র কবিতাগুচ্ছ
মলয় রায়চৌধুরী'র কবিতাগুচ্ছ

নাজামো শেখের জন্য একটি কবিতা


আমরা দুজনে একই গর্ভে আছি
এই লাল রঙের জগত দেখছিস চারপাশে
এটাই একমাত্র কমিউনিস্ট দেশ
তুই যতোটা খেতে পাস আমিও ততোটা খাই
এখানে পোশাকের কোনো প্রয়োজন নেই
লজ্জা পেতে শেখায়নি এই কমিউনিস্ট দেশ
দুজনে একই সঙ্গে সাঁতরাই লাল রঙের সমুদ্রে
হাঙরেরা হাঁ-মুখ তুলে আমাদের দিকে ছুটে আসেনা কখনও
কোনও ডিকটেটার নেই যে আমাদের জেলে পুরবে
ধর্মের দোহাই দিয়ে আমাদের আলাদা করবে
যার গড়া কমিউনিস্ট দেশে রয়েছি আমরা দুজনে
সে আমাদের ভালো থাকা নিয়ে অহরহ ভাবে
আমাদের দুজনকে একই গান শোনায়
তুই আমাকে যেমন ভালোবাসিস
সেও আমাদের দুজনকে তেমনই ভালোবাসে
কারণ এটাই একমাত্র কমিউনিস্ট দেশ

শিরোনামহীন - এক

হিস্টিরিয়া হয়ে গেছে নদী খেত গাছ পালা জীবজন্তুদের
দেখতে পাচ্ছেন, নদীটা নির্জলা উপোসী রয়েছে তিন বছর ধরে
খেতের মাটিগুলো রোদ্দুরে কাশতে কাশতে বুকপেট ফেটে চৌচির
কোন গাছে আম হতো কোন গাছে লিচু নিজেরাই ভুলেছে গাছগুলো
শালা ঈশ্বরের কোনো দয়ামায়া নেই, কবে থেকে চাইছি সবাই
বন্যা আসুক তেড়ে বানভাসি হামলে পড়ে নিয়ে যাক সবকিছু
জায়গাটা অন্তত বেঁচে তো উঠবে আবার ; আমরা মরি তো মরব
মরতে তো হবেই একদিন কিন্তু পৃথিবীটা মরে যাক কেউই চাই না

শিরোনামহীন - দুই

দুই দিক থেকে ধরে বাক্যটাকে বেঁকিয়ে পেঁচিয়ে তুলি
চিৎকার করে বলে, কি করছেন, যন্ত্রণা সহ্য করতে পারছি না
বলি, শালা বাক্য হয়েছ কেন ? ছাগল শুয়োর হতে পারতে তো
কবিতায় কাজে আসতো, ওদের পোশাক আশাক নেই
গনগনে লোহা পেটেতে ঢুকিয়ে দাও গলায় ঘ্যাঁচাৎ করে খাঁড়া
ভবিতব্য স্যার ভবিতব্য, বাক্যটা কাতরে উঠে বলে
বাক্য হতে চাইনি মোটেই, আপনিই বাক্য বানিয়ে মুচড়ে দিচ্ছেন
বলি, যাহ শালা, এবারের মতো তোকে ছেড়ে দিচ্ছি
অন্য কারোর কলমেতে গিয়ে ঢোক যে তোকে দুহাতে চটকাবে
চুমু খাবে ; বেঁকিয়ে পেঁচিয়ে তুলে সরকারি খোরপোষ পাবে

ডেথ মেটাল

মুখপুড়ি অবন্তিকা চুমু খেয়ে টিশ্যু দিয়ে ঠোঁট পুঁছে নিলি ?

শ্বাসে ভ্যাপসা চোখের তলায় যুদ্ধচিহ্ণ এঁকে ডেথ মেটাল মাথা দোলাচ্ছিস

চামড়া-জ্যাকেট উপচে লালনীল থঙ গলায় পেতল-বোতাম চোকার

ঝাপটাচ্ছিস সেকুইন গ্ল্যাম রকার খোলা চুল কোমরে বুলেট বেল্ট

বেশ বুঝতে পারছি তোকে গান ভর করেছে যেন লুঠের-খেলা

স্ক্রিমিং আর চেঁচানি-গান তোর কার জন্য কিলিউ কিলিউ কিল

ইউ, লাভিউ লাভিউ লাভ ইউ কাঁসার ব্যাজপিন কব্জিবেল্ট

কুঁচকিতে হাত চাপড়ে আগুনের মধুর কথা বলছিস বারবার

আমি তো বোলতি বন্ধ থ, তুই কি কালচে ত্বকের সেই বাঙালি মেয়েটা ?

কোথায় লুকোলি হ্যাঁরে কৈশোরের ভিজেচুল রবীন্দ্রনাথের স্বরলিপি

কবে থেকে নব্বুই নাকি শূন্য দশকে ঘটল তোর এই পালটিরূপ

পাইরেট বুট-পা দুদিকে রেখে ঝাবড়া চুলে হেড ব্যাং হেড ব্যাং হেড ব্যাং

ঝাঁকাচ্ছিস রঙিন পাথরমালা বুকের খাঁজেতে কাঁকড়া এঁকে

পাগলের অদৃশ্য মুকুট পরে দানব-ব্লেড বেজ গিটারে গাইছিস

বোলাও যেখানে চাই নেশা দাও প্রেম-জন্তুকে মারো অ্যানথ্র্যাক্স বিষে

মেরে ফ্যালো মেরে ফ্যালো মেরে ফ্যালো কিল হিম কিল হিম কিল

কিন্তু কাকে বলছিস তুই বাহুতে করিটি উল্কি : আমাকে ?

নাকি আমাদের সবাইকে যারা তোকে লাই দিয়ে ঝড়েতে তুলেছে ?

যে আলো দুঃস্বপ্নের আনন্দ ভেঙে জলের ফোঁটাকে চেরে

জাপটে ধরছিস তার ধাতব বুকের তাপ মাইকে নিঙড়ে তুলে

ড্রামবিটে লুকোনো আগুনে শীতে পুড়ছিস পোড়াচ্ছিস

দেয়াল পাঁজিতে লিখে গিয়েছিলি ‘ফেরারি জারজ লোক’

ভাঙাচোরা ফাটা বাক্যে লালা-শ্বাস ভাষার ভেতরে দীপ্ত

নিজেরই লেখা গানে মার্টিনা অ্যাসটর নাকি ‘চরমশত্রু’ দলে

অ্যানজেলা গস কিংবা ‘নাইট উইশ’-এর টারজা টুরম্যান

লিটা ফোর্ড, মরগ্যান ল্যানডার, অ্যামি লি’র বাঙালি বিচ্ছু তুই

লাল নীল বেগুনি লেজার-আলো ঘুরে ঘুরে বলেই চলেছে

তোরই প্রেমিককে কিল হিম লাভ হিম কিল হিম লাভ হিম লাভ

হিম আর ঝাঁকাচ্ছিস ঝাবড়া বাদামি চুল দোলাচ্ছিস উন্মাদ দু’হাত…

জগজ্জননী অবন্তিকা

রক্ত তৈরি হচ্ছে তোর দেহে
শুনতে পাই মিহিন আওয়াজ
.
সাহিত্যিক ক্রিমিনাল আমি
ইচ্ছামতন শব্দদের ভাঙি
.
প্রথম চুমুর স্মৃতি আছে
প্রজাপতি উড়েছিল পেটে
.
কার শবে সুগন্ধ ছিল বল
র‌্যাঁবো নাকি রবিঠাকুরের
.
যত শিগ্গিরি পারি মানেদের
মুছে ফেলে অন্য মানে দিই
.
ব্যকরণ এমন শয়তান
অথচ মারা পড়ে আমি ছুঁলে
.
ব্যাখ্যাদের তুলে নিয়ে গিয়ে
ধাপার জঞ্জালে ফেলে দিই
.
মর্ত্য যে যক্ষ্মায় ভুগছে
পালাবার পথ কারো নেই
.
শ্রেষ্ঠ দুঃস্বপ্ন সুসৃজন
কবিতা খোঁচাতে পারে ডোম
.
ক্যালেন্ডারে কবে ঢুকবে ভেবে
মধ্যবিত্ত হিমশিম খাক
.
পয়লা জানুয়ারি নাকি বৈশাখ
জন্ম-মৃত্যুর মাঝে ডুবে
.
মজার ব্যাপার হলো
আমরা মানুষ এখনও
.
হায় নরহত্যার অভিলাষ
সকলে মেটাতে পারে না
.
এরা বলে আমি ফেরাউন
ওরা ডাকে ব্যাটা মালাউন
.
আমার নির্দিষ্ট বাড়ি নেই
শহর থেকে শহরে ঘুরেছি
.
রক্ত তোর তৈরি হচ্ছে দেহে
তাতে প্রেম পুরোটা আমার

ইলোপকন্যা


তোর বেডরুমে তোকে পেলুম না, কি ঝঞ্ঝাট, মানে হয়
অবন্তিকা, কোন নদী নিয়ে গেছে, বরফের ডিঙি ভাসালুম
দ্যাখ, কেলেঘাই চূর্ণী গুমনি জলঢাকা ময়ূরাক্ষী কংসাবতীর
স্রোতে, তোর ঘাম নেইকো কোথাও, ভাল্লাগে না, জেলেরাও
পায়নি তোর ফেলে দেয়া অন্ধছোঁয়া, পূর্ণিমাও অন্ধকারে,
কি করে চলবে বল, পেঁয়াজের কান্না নেই, ধ্যাৎতেরি
চুড়ির বাজনাহীন, চুমুগুলো কোন সপ্নে রেখে গিয়েছিস
খুঁজে পাচ্ছিনাকো, কাউকে তো বলে যাবি, মুখের প্রতিবিম্ব
আয়নাসুদ্দু ফেলে দিয়েছিলি, ওঃ কি মুশকিল, পাশে-শোয়া শ্বাস
অন্তত রেখে যেতে পারতিস, আলমারি ফাঁকা কেন, বালিশে
খোঁপার তেল নাভির তিল কাকেই বা দিলি, চেনাই গেল না
তোর মনের কথাও, টুথব্রাশে কন্ঠস্বর নেই, চটিতে নাচও
দেখতে পেলুম না, এমন কষ্ট দিস কেন অবন্তিকা, চুলের
নুটিতে থাকত ডাকনাম, ফুলঝাড়ু চালিয়েও সাড়া পাচ্ছি না,
অফিস যাবার রাস্তা এসে তোর জন্যে মাকড়সার জালে
হাতের রেখা সাজিয়ে চলে গেল তোরই মুখের ইলিশস্বাদ
নিয়ে। আরে, ওই তো, যে-ছোকরার সঙ্গে পালিয়েছিলি তুই
তারই জুতোর ছাপের স্বরলিপি মার্বেল মেঝেয় আঁকা...

আমার স্বদেশ


আমার পক্ষে বলা সম্ভব নয় যে আদিবাড়ি উত্তরপাড়া আমার দেশ নয়
জানি গঙ্গায় অপরিচিতদের চোখ খুবলানো লাশ ভেসে আসে
আমার পক্ষে বলা সম্ভব নয় যে পিসিমার আহিরিটোলা আমার দেশ নয়
জানি পাশেই সোনাগাছি পাড়ায় প্রতিদিন তুলে আনা কিশোরীদের বেঁধে রাখা হয়
আমার পক্ষে বলা সম্ভব নয় যে মামার বাড়ি পাণিহাটি আমার দেশ নয়
জানি কোন পাড়ায় দিনদুপুরে কাদের খুন করা হয়েছে
আমার পক্ষে বলা সম্ভব নয় যে শৈশবের কোন্নোগর আমার দেশ নয়
জানি কারা কাদের দিয়ে কাকে গলা কেটে মারতে পাঠায়
আমার পক্ষে বলা সম্ভব নয় যে যৌবনের কলকাতা আমার দেশ নয়
জানি কারা কাদের বোমা মারে বাসে-ট্রামে আগুন লাগায়
আমার পক্ষে বলা সম্ভব নয় যে পশ্চিমবঙ্গ আমার দেশ নয়
এদেশের লকআপে পিটুনি খেয়ে থেঁতলে মরার অধিকার আমার আছে
এদেশের চা-বাগানে না খেতে পেয়ে দড়িদঙ্কা হবার অধিকার আমার আছে
এদেশের চটকলে গলায় দড়ি দিয়ে ঝোলার অধিকার আমার আছে
এদেশের দলগুণ্ডাদের পোঁতা মাটির তলায় হাড় হবার অধিকার আমার আছে
এদেশের ধনীদের ফাঁদে ফেঁসে সর্বস্বান্ত হবার অধিকার আমার আছে
এদেশের শাসকদের বাঁধা লিউকোপ্লাস্ট মুখে বোবা থাকার অধিকার আমার আছে
এদেশের নেতাদের ফোঁপরা বক্তৃতা আর গালমন্দ শোনার অধিকার আমার আছে
এদেশের অবরোধকারীদের আটকানো পথে হার্টফেল করার অধিকার আমার আছে
আমার পক্ষে বলা সম্ভব নয় যে বাংলা ভাষা আমার স্বদেশ নয়...


সাবস্ক্রাইব করুন! মেইল দ্বারা নিউজ আপডেট পান