সেলিনা শেলী । কয়েকটি কবিতা
সেলিনা শেলী । কয়েকটি কবিতা

এ রোদ পলকা আলো,ছেনাল- প্রবণ


এই রোদ মচমচে নয়

অথচ কী ঝাঁ চকচকে!

হাওয়ার চাদরে ঢাকা সে এক শীতল প্রতারক!

মেরুর বিন্দু ছুঁয়ে বরফের দানামাখা

সফেদ ফরাস,--যেনো আপাদ ভদ্রালোক, তবে ভদ্রলোক নয় জেনো;

আড়মোড়া ভেঙে ছাড়ে;পথে যে নামায়!

পথে পথে রোদের বাহার,চূর্ণ তুষারের ত্রসরেণু রেখা

এতো রোদ!ওম নেই,কী বিষণ্ণ একা!


এ রোদ পলকা আলো,ছেনাল- প্রবণ!

মানুষের ত্বকে ডুবে উষ্ণতা খায়।

এ রোদ নপুংসক,তবু--

দিব্যি হাসে,যেনো রাজার জামাই!


ভুল করে রোদের ছলে পড়ো না যেনো!

এশীয় চামড়ায় এসে সাদা রোদ 

বরফের ফোস্কা এঁকে দেবে!

এ বড় বিদেশবিভুই!মেরুর ছলনায় তুমি 

পথ হারাবে।



মাতাল মহিমা 


রাত তার সবটুকু মহিমা মেখে আদেহ চুম্বন করে যায়

অন্ধকার অলোখঝরার মতো বেদনার দানাগুলো মদিরায় জড়ায়।


মাতাল গ্লাসে ছড়িয়ে পড়া বরফের স্বেদ

যেনো জমে ওঠে শরীরে আমার!

ব্রহ্মাণ্ডও দু'পেগ অন্ধকার গিলিয়ে বলে

কামেতে রেখো না মেয়ে কোনো লজ্জা লাজ।


বিভুঁতি ছড়িয়ে পড়ে,আমি শুধু গলে গলে পড়ি

আত্মহনন!দালির ঘড়ি,নাকি বেশ্যার শাড়ি!

সময়ের সময় জেনে কী লাভ আমার

ক্যালেন্ডারের পাতাগুলো কেবলই আন্ধার। 


একটা প্রেম এসে তারুণ্য দিনে,কবে ছুঁয়েছিলো বুকের কুসুম!

স্মৃতির ধুলো ঝেড়ে  দেখি,কী তুমুল টানে সেই আধখানা চুম!

সেও আসে নবীন যুবক!

সেই যে চোখের চমক 

আর 

আঙুলের ভাষা-- 

আঁধারের অধিক আজও তার সম্মোহন!


আজও সেই চোখের তীরে বিদ্ধ করি দেহ

অন্ধকার গিলে ভাসি অন্ধ উজানে

থাকে না কিছুই আর,

না আমি না আন্ধার।

দেহ জুড়ে খেলে যায় চুম্বন বাহার।

আমি কী আমার থাকি!না থাকি তাহার!


টোকা

 বাতাস ত্রিভঙ্গে নাচে ভরত নাট্যমে

ক্লেদে ফুলে কাঁটায় কতো কথা জমে!


কে কাকে নাচায় বলো,বাতাস না পাতা!

এইসব প্রতর্কে থাক হিসেবের খাতা।


আমার চক্ষু পাতা সোনালি ফরাসে

পাতাদের হাহাকারে বুক চেপে আসে।


বিদায় বাকল পাতা ঝরে ঝরে পড়ে

শূন্য মৃদঙ্গ বাজে কার যে অন্তরে!


বুঝেছি কুয়াশার দিন চোখভরা ছানি

জীবন করেছে পার নিদয় শীতখানি।


তেজে তাপে পল্লবে লহরি আভায়

সে যায় কুলুঙ্গি খুলে স্বপ্ন মদিরায়।


বর্ণিল কুসুম খায় আয়ু,অন্ধকার দাঁতে

আত্মা সিনান সারে পাপ-পূণ্য প্রপাতে।


কামান্ধ সারস কাঁদে শূন্য বুক চিরে

কিছু কিছু শিৎকার পড়ে থাকে ভিড়ে!


জীবন চলে গেলে হায় রেখে যায় টোকা

কোথাও কিছু নেই আর,সবটুকু ধোঁকা।



অলোখঝরা


ছুঁতে গেলে মনে হয় কী দূরত্ব তোমার!

বুকের ভেতর কাঁদে একা ইহকাল

কুড়িয়ে পাওয়া নদী কোথায় হারায়

ব্রহ্মাণ্ড  হাই তুলে কেবল ঘুমায়


নক্ষত্র নদীর মতো কেনো ভেসে যায়!


আঙুলে তৃ্ষ্ণা ছিলো পারি নি ছুঁতে

গোপন আংটি কেবল মসলিন লুকায়

স্বর্গগঙ্গা দেখার ছলে রাত্রি বুনে যাই

হয়তো প্রেম নয়,দেহ কলস উছলায়।



যে মেঘ ঝরার আগে দিয়েছে শূন্যতা

ভেতরে ভাঙেনি ভাঁজ আড়মোড়া কাম

দূর কোন্  দিগন্তের রঙশালা হতে

রঙ নিয়ে চলে যায় সূর্য দাপুটে।


প্রেমের মতো ঘ্রাণ নাকে এসে লাগে

নিদ্রাকুসুম মেখে  কে কোথায় জাগে!



(সীতাকুণ্ডের জঙ্গলে সাত বছরের ইরামণিকে একদল অমানুষ ধর্ষণ করে তার শ্বাসনালি কেটে মৃত ভেবে পালিয়ে যায়। জ্ঞান ফিরে আসার পর কণ্ঠনালি ও ক্ষতবিক্ষত যৌনাঙ্গে রক্তাক্ত শিশুটি বাঁচার জন্যে টলমল পায়ে সড়কের দিকে হাঁটতে থাকে।একদল শ্রমিক তাকে পেয়ে গলায় কাপড় জড়িয়ে উপজেলা হাসপাতালে নিয়ে যায়।মুমূর্ষু তাকে সেখান থেকে শহরের মেডিকেলে নেয়া হয়। অপারেশনের পর সে অনন্ত হয়ে ওঠে।
কাল সারারাত ঘুমাতে পারি নি। এটি কোনো কবিতা নয়। এটি আমার অক্ষম ক্ষোভ। আমি আর কীইবা করতে পারি ইরামণি!)



বাংলাদেশ কথা বলতে পারছে না


বাংলাদেশ কথা বলতে পারছে না।

তার কাটা শ্বাসনালী চিরে রক্ত ঝরছে--

স্নায়ু আর মস্তিষ্ক জুড়ে অন্তর্বিদ্ধ লাঞ্ছিত সময়

মজ্জায় তবু তার উন্মীলিত বাঁচার টলমল চলা।

সে হাঁটছে-- বেরিয়ে আসছে পাহাড় জঙ্গল ঝোঁপ পেরিয়ে,

তার জন্মজরায়ু ছিঁড়ে ক্ষতবিক্ষত হায়েনার ছোবল- রক্তনদী।

তার সবুজ শিশু-শরীরে কী পাপ জমা করেছিলো সে?--

মানুষের রচিত অভিসন্দর্ভের পেটে এর কোনো জবাব নেই।

বিষাদবিদ্ধ,আহত, রুগ্ন,বিষণ্ণ,বিপন্ন,লাঞ্ছিত-

কোনো শব্দই ধর্ষিত ইরামণির প্রতিশব্দ নয়।

উগ্রতান্ধদের বিম্বিত ধর্মের আলখাল্লায় ঢাকা বাংলাদেশ 

ধর্ষকদের বিচারহীন শিশ্মোত্থিত কাপুরুষের বাংলাদেশ

বিকলনময় এই সময়ে তুমি-বাংলাদেশ--

আর কতো ক্ষতবিক্ষত হলে 

মেয়েজন্মের সমস্ত গ্লানি-বেদনা

ঝেড়ে ফেলে,রক্তবোধিময় শরীর ভুলে

মনউন্মীলনে শুধু মানুষের নিরাপদ ভূখণ্ড হয়ে উঠবে?


সাবস্ক্রাইব করুন! মেইল দ্বারা নিউজ আপডেট পান