কয়েকটি কবিতা ।। সাযযাদ আনসারী
কয়েকটি কবিতা ।। সাযযাদ আনসারী
চির বিমূর্ত ভুবনবন্ধু আমার

দূরন্ত আকাশ হানা দেয় চোখের চত্তরে
আমি তোমাকে শুনি শূন্যের শান্ত স্বরে
নিঃশব্দ শিশিরের সঙ্গীত সঙ্গতের মত।

একদিন উৎসারিত গভীর আলোর আড়ালে
রাত্রিতে তারার ভিড়ে উত্তরের একটি তারা
আমাকে হঠাৎ নেবে ডেকে চরম আলিঙ্গনে।

আমাদের সকল স্বপ্নের আসর,আমাদের
প্রবল প্রজাপতি দিন, জোনাকি ঝাঁকের
জন্মোউৎসব, অজস্র অক্ষরের রৌদ্রবেলা,
কুড়িয়ে নেবার অপেক্ষায় ঘাটে যাবে কেউ।

এই অপেক্ষা অশেষ নয়— অশেষ শুধু
তোমার গানের তরীর তাড়া, তোমার একটি
নিভৃত ইঙ্গিত আর নিখুঁত নির্মল আহ্বান—

চির গহীনের চির বিমূর্ত ভুবনবন্ধু আমার
আয়ুগত আলোর অর্ঘ,
কোনো এক প্রবীন বৃক্ষের বিদগ্ধ বুকেই
তোমার আমার— সমস্ত অবসন্নের অবসান।

মেঘের গন্ধ আসে

গোলাপের গভীর গন্ধের মত
মেঘেরো কি তীব্র গন্ধ আছে?
যেকথা কালিদাস ভুলে গেছে
যে সুবাস ছড়ায়নি কখনো বাতাস!
সেই সুমন্দ গন্ধ আমিতো টের পাই।

যখন আকশ জ্বলে যায়! রোদ্রের রঙে
তখন মেঘের পোড়া গন্ধ এসে
আমাকেই পোড়ায়—
পাহাড়— নদী— বন— পেরিয়ে
মেঘদূত আসে মেঘের বিরহী পত্র হাতে।

আমিতো টের পাই ভুলের মূল্য কত যে বড়,
সেই মধ্যরাত—
হঠাৎ ভুল ছোঁয়া লাগা মিথ্যে অভিমান
এখন বৃষ্টি আসেনা— ময়ুর করেনা গান।

অবরুদ্ধ হৃদয়ের মুক্তি লিখতে লিখতে
কল্পনা দত্ত আসে মেঘের বজ্রগন্ধে ভেসে।

আমিতো দুঃশাসন নই

তুমি আর দেখোনি তোমার রোদ্রের রঙ
যৌবনে যা দেখেছিলে বনের বাতাসের
মৃদুমন্দ স্বরে নরম স্পর্শের ভেতর একাগ্রে।

তার পর কত বসন্তের বাতাস হয়েছে গত;
কত গ্রাম গেছে গ্রাম্যতার অসভ্য আঁচলে
কত নদীর কিনার, পায়েচলা পথ, কুয়োতলা,
শঙ্খচুর সাপের সন্ধ্যা, ভয় ভয় রাত কিংবা
সরষে ক্ষেত মাড়িয়ে রাখালের হেঁটে যাওয়া
হয়ে গেছে অতীত অক্ষরের ম্লান মুদ্রিত গান।

আমরা নেমে গেছি সময়ের শাস্তি বেয়ে
এক জটিল নগরীর প্রেম ও শ্মশান শব্দে
আমরা চলে গেছি বন্ধনহীন কালের দূরতম
দ্বীপের দুয়ারে।
এইভাবে নিঃশব্দে সরে গেছে সব রোদ
এইভাবে যেতে যেতে ছায়া ছুঁয়েছে ধুলিপথ।

যাক সব— আমিতো দুঃশাসন নই
ভয় কি তোমার দূরের দ্রৌপদী!
ওই অস্তাচলেই বাজুক না মেঘের মাদোল।

যদি আবার আমার বনভূমি

আমি একটা বিশুদ্ধ বীজ চাইলাম
তুমি বললে জলটুকু ধুয়ে আনো
আমি জল ধোয়ার জল খুঁজতে খুঁজতে,
সমস্ত রোদের রঙ ধুয়ে ফেললাম,
আমার ক্লান্ত দেহ ঘাম গলিয়ে জল হলো,
তবু মেঘ আর এলো না বৃষ্টিও এলো না।

আমি জল ধোয়ার জল আর পেলাম না।

তারপর আমি চাইলাম, যত ছোটই হোক
আমাকে পূর্ণবয়স্ক একটা পবিত্র ফুল দাও
আমি পরাগায়ণ করে বীজ করে নেবো,
তুমি বললে তা হবে।কিন্তু কিছুতো চাই।

না তেমন কিছুই চাই না,
শুধু বিশ্বায়নের বুক চিরে
একবিন্দু হৃদয়ের রঙ এনে দাও।

আমি সারা পৃথিবী ঘুরতে ঘুরতে একটি
কারখানা,একটি বাজার,একটি রঙ্গমঞ্চও
পেলামনা, যেখানে
মানুষ রচনার রঙ
রাখা আছে খুব যত্ন করে। ততক্ষণে
আমার আকাশ শব্দ শূন্য হয়ে গেছে,
আমার সূর্য অস্তাচল স্পর্শ করে ফেলেছে।

অবশেষে আমি
নিজের প্রাণটাই রোপন করে দিলাম
নিজেরই রক্তের ভেতর,
যদি সেই অঙ্কুর উদ্গত হয়,
যদি সেই ফুলগুলি আবার ফোটে,
যদি আমার একলা পাখি আবার গেয়ে ওঠে,
যদি আবার আমার বনভূমি হয়ে ওঠে
বনে বনে আরাধ্য শস্য-শ্যাম সুন্দর!

ঘুমের দেশ

পৃথিবীতে একটাই আছে ঘুমের দেশ
সে আমারই গহীন গানের অন্ধকারে।

কেউ কেউ স্বপ্ন ভাঙে, প্রস্তুত হয় না,
কেউ কেউ সুগন্ধি সমুদ্রের বুক
ছোঁবে বলে, স্বপ্নে ভাসে, প্রস্তুত হয় না
সব স্বপ্ন জ্বলে যায়— জ্বলে ওঠে না।

পৃথিবীর ভয়ংকর ধীবর দেশ গুলো
জাল ফেলে আছে ঘুমের চারপাশে।

এখানে মানুষ এখন একা।একা একা
ঘুমন্ত মানুষ ধরা পড়ে ধীবরের জালে।

পৃথিবীতে একটাই আছে ঘুমের দেশ
সে আমারই গহীন গানের অন্ধকারে।

এই অন্ধকার জটিল জরায়ু প্রস্তুত হলে
ঘুম সরে গিয়ে স্বপ্নের রোদ লেখাহবে।


সাবস্ক্রাইব করুন! মেইল দ্বারা নিউজ আপডেট পান