মুক্ত ডানার ইমাম । আনোয়ার রশীদ সাগর
মুক্ত ডানার ইমাম । আনোয়ার রশীদ সাগর
আষাঢ়ের আগমনী বার্তা তখন কাঁসার থালার মতো আকাশে বাজছিল। মেঘের গর্ভ থেকে নেমে আসা বাতাসে পাটক্ষেতের ডগা কাঁপে, ধানভুরুর শীষে দুধ জমে সাদা মুক্তোর মতো। বাগানে বাগানে টিয়ে পাখির দল কলকাকলিতে ভরিয়ে দেয় দুপুর — যেন সবুজ পাতার ভেতর থেকে একদল কবি আবৃত্তি করছে প্রকৃতির কবিতা।  

সেই আষাঢ়ের এক মেঘলা সকালে শিশু আব্দুল্লাহ হঠাৎ বাবা আজিমউদ্দিনের বাঁশের খাঁচার দরজা খুলে দিল। দুটো টিয়ে — সবুজ ডানায় লাল ঠোঁটের আগুন — মুহূর্তে উড়ে গেল বাগানের ডাকের দিকে। খাঁচা খালি, বাতাসে তখনো পালকের উষ্ণতা লেগে আছে।  

আজিমউদ্দিন পাশের মসজিদের মুয়াজ্জিন। আসরের আজান দিতে গিয়ে দেখলেন খাঁচা শূন্য। ছেলের দিকে তাকালেন — চোখে বেতের শাসন নেই, আছে বিস্ময়। আব্দুল্লাহ শুধু বলল, “বাবা, ওরা ডাকছিল। খাঁচায় থাকলে ডাকটা কান্না হয়ে যায়।”  

আজিমউদ্দিনের গলা থেকে আজানের সুর সেদিন একটু কেঁপে উঠেছিল। যেন মিনার থেকে নয়, তাঁর বুকের ভেতর থেকে আজান উঠছে — “হাইয়া আলাল ফালাহ”, কল্যাণের দিকে এসো। মুক্তির দিকেই তো কল্যাণ।  

দিন গড়ায়। ধানভুরুর দুধ শীষ সোনা হয়, কাটা পড়ে, আবার নতুন চারা জাগে। আব্দুল্লাহও বাড়ে। প্রথমে পাশের গ্রামের মাদ্রাসায় দেয় বাবা। কিন্তু চারদিক তখন অন্ধকারের কুয়াশায় ঢাকা। খবরের কাগজে শিশুর কান্না, মাদ্রাসার অন্ধকূপে বলৎকারের খবর — সমাজের বুকে কালো কালির আঁচড়। আজিমউদ্দিনের বুক কাঁপে। যে হাতে ছেলেকে কোরআনের পাতা ওলটাতে শিখিয়েছেন, সেই হাতে তিনি আব্দুল্লাহকে টেনে আনেন আলোর দিকে। পাশের হাইস্কুলে ভর্তি করান।  

“ইলম তো খাঁচার পাখি না বাবা, ও তো আকাশ”, আজিমউদ্দিন বলেন।  

স্কুলের মাঠে কদমগাছের ছায়ায় বসে আব্দুল্লাহ পড়ে। বিজ্ঞানের বইয়ে সে দেখে মেঘ কীভাবে বৃষ্টি হয়, সাহিত্যের পাতায় দেখে রবীন্দ্রনাথ কীভাবে ‘ডাকঘর’ লেখেন। আর সন্ধ্যায় বাবার কাছে বসে শেখে সুরা ফাতিহার অর্থ। দুই নদীর মতো দুই ধারা তার বুকে মেশে — একটার নাম জ্ঞান, আরেকটার নাম ঈমান।  

নরম, ভদ্র, প্রকৃতি-প্রেমী আব্দুল্লাহ যেন ভোরের শিশির। কারো গায়ে কাঁটা ফোটায় না, বরং দূর্বাঘাসের ডগায় মুক্তোর মতো লেগে থাকে। কলেজ থেকে বিএ পাশ করে সে। তারপর বিয়ে করে সুন্দরী, সুশ্রী মেয়ে আমিনাকে — যার হাসি ছিল নদীর ঢেউয়ের মতো নির্মল, চোখ দুটো ছিল হরিণের চোখের মতো শান্ত।  

বছর ঘোরে। দুটো সন্তান আসে ঘরে — একটা ছেলে, একটা মেয়ে। নাম রাখে ‘মুক্তি’ আর ‘আলো’। আব্দুল্লাহ ততদিনে বাবার সেই মসজিদের ইমাম। কিন্তু মিম্বরে দাঁড়িয়ে সে বেতন নেয় না।  

“ওয়া লা তাশতারু বিআয়াতি সামানান কালীলা” — আল্লাহর আয়াতের বিনিময়ে তুচ্ছ মূল্য গ্রহণ করো না [সুরা বাকারা: ৪১]। আব্দুল্লাহর কণ্ঠে যখন আয়াত নামে, মনে হয় মসজিদের দেয়ালও কেঁপে ওঠে।  

“ইমামতি বিক্রির জিনিস না বাবা, এটা আমানত”, সে বলে। গ্রামের অনেকে ভ্রু কুঁচকায়। “হুজুর, পেট চলবে কেমনে?”  

আব্দুল্লাহ হাসে। মসজিদের পাশেই খোলে ‘মদিনাখানার দোকান’। চাল, ডাল, তেল, নুন — সাথে খাতা, কলম, শিশুদের জন্য লজেন্স। দোকানের বেড়ায় লিখে রাখে — “সতাই পুঁজি, মিথ্যা বাকি নেই”।  

ঝড় ওঠে তখনই। দেশের বিভিন্ন ইসলামি দল আসে গ্রামে। কেউ হাদিয়া চায়, কেউ ইয়ানত, কেউ চাঁদা — “দ্বীনের কাজে লাগবে”। কারো পাঞ্জাবিতে আতরের গন্ধ, কারো চোখে ক্ষমতার ঝিলিক। আব্দুল্লাহ দোকানের ক্যাশবাক্স বন্ধ করে দাঁড়ায়।  

“আল্লাহর কোরআন-হাদীস প্রচার করে অর্থ নেওয়া যাবে না। রাসূল ( স.) বলেছেন — ‘তোমরা আমার কাছ থেকে কিছু চেও না, আমি তোমাদের কাছে কিছু চাই না’ [মুসনাদে আহমদ: ২২১৬০]। দ্বীন বিক্রির বাজার আমি মানি না।”  

প্রথমে আসে ‘হেফাজতে শরিয়ত পরিষদ’। মাইক লাগিয়ে চাঁদা তুলতে চায় তাফসীর মাহফিলের নামে। আব্দুল্লাহ জুমার খুতবায় দাঁড়িয়ে খুলে ধরে কোরআন — “ইত্তাবিউ মা উনজিলা ইলাইকুম মির রাব্বিকুম” [সুরা আরাফ: ৩] — তোমাদের রবের পক্ষ থেকে যা নাজিল হয়েছে তার অনুসরণ করো। পাতা নম্বর, আয়াত নম্বর, তাফসীর ইবনে কাসীরের ব্যাখ্যা — গ্রামবাসীর সামনে পানির মতো পরিষ্কার করে দেয়। নেতাদের মুখ শুকিয়ে আমসি হয়ে যায়। তারা গজগজ করতে করতে ফিরে যায় — যেন ভাটার টানে নদী থেকে নৌকা সরে গেল।  

তারপর আসে ‘খেদমতে ইসলাম ফাউন্ডেশন’। রঙিন পোস্টার, মোটা রশিদ বই। “মাদ্রাসা বানাবো, এতিম খাওয়াবো”। আব্দুল্লাহ জিজ্ঞেস করে, “হিসাব কে দেবে? রাসূল  ( সঃ)  কি এতিমের নামে চাঁদা তুলে নিজের পকেট ভারী করেছেন? সুরা মাউন পড়েন — ‘ফাওয়াইলুল লিল মুসাল্লীন, আল্লাযীনা হুম আন সালাতিহিম সাহূন, আল্লাযীনা হুম ইউরাউনা ওয়া ইয়ামনাউনাল মাউন’ — ধ্বংস সেই নামাজির জন্য, যারা লোক দেখায় আর নিত্য ব্যবহার্য জিনিস দিতেও অস্বীকার করে।”  

জনতার চোখ খুলে যায়। রশিদ বই গুটিয়ে নেতারা পালায় — যেন ঝড়ের মুখে কলাপাতা উড়ে গেল।  

ষড়যন্ত্র শুরু হয়। রাতের আঁধারে আব্দুল্লাহর দোকানের ঝাঁপে কেরোসিন, ফজরের আগে মসজিদের দেয়ালে পোস্টার — “আব্দুল্লাহ কাফের, ইয়াজিদবাদী, ইহুদিদের দাল” ইত্যাদি । 
একদিন এশার নামাজের পর তাকে ঘিরে ধরে দশ-বারো জন। লাঠি, রামদা চাঁদের আলোয় চকচক করে — যেন হায়েনার দাঁত।  

“মসজিদ ছাড়, নইলে লাশ পড়বে।”  

আব্দুল্লাহর বুক কাঁপে না। তার চোখে ভাসে সেই আষাঢ়ের দিন — খাঁচা খুলে দেওয়া টিয়ের ডানা। সে শুধু বলে, “ভাই, সূরা কাহাফের সেই যুবকদের কথা মনে আছে? তারা সত্যের জন্য গুহায় লুকিয়েছিল। আমি মসজিদ ছাড়ব না। মারলে মারো, সত্যের লাশ হয় না। তাছাড়া মৃত্যু আল্লাহর হাতে তোমাদের হাতে নয়।"

লাঠি ওঠে, কিন্তু গ্রামের কিশোর রফিক, কলেজপড়ুয়া সুমি, স্কুলশিক্ষক কাদের মাস্টার দৌড়ে আসে। “ইমাম সাহেবের গায়ে হাত দিলে গ্রামে আগুন জ্বলবে।” হায়েনার দল পিছু হটে — যেন কুকুরের দল বাঘের গর্জনে লেজ গুটিয়ে পালায়।  

আব্দুল্লাহ একা হয়ে যায়, কিন্তু ভাঙে না। বটগাছ যেমন ঝড়ে মাথা নোয়ায়, শিকড় নোয়ায় না। সে তার দোকানের পেছনের ঘরটাকে বানায় পাঠাগার। নাম দেয় ‘আলোঘর’। নিজের জমানো টাকায় কেনে কোরআন, হাদীস, বিজ্ঞান, ইতিহাস, রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, বেগম রোকেয়া, আহমদ ছফা, হুমায়ুন, জীবনানন্দ, শামসুর রাহমান, আল মাহমুদ।   দেয়ালে লেখে — “পড়ো, তোমার রবের নামে”।  

ধীরে ধীরে জমে তরুণের দল। রফিক পড়ে ‘বিশ্বসভ্যতা’, সুমি পড়ে ‘মতিচুর’, ছোট্ট মুক্তি পড়ে ‘ঠাকুরমার ঝুলি’। তারা বোঝে — ধর্ম মানে ভয় নয়, ধর্ম মানে মুক্তি। ইসলাম মানে দাড়ি-টুপির ব্যবসা নয়, ইসলাম মানে ইনসাফ।  

মৌলবাদীরা আবার আসে। এবার ওয়াজ মাহফিলের নামে। “নারী নেতৃত্ব হারাম, গান-বাজনা হারাম, ছবি তোলা হারাম” — মাইকে বিষ ঢালে। আব্দুল্লাহ পাঠাগারের ছেলেমেয়েদের নিয়ে মাহফিলের মাঠে যায়। হাতে মাইক নয়, হাতে বই।  

সে পড়ে শোনায় — “ওয়া কুল লিল মু’মিনাতি ইয়াগদুদনা মিন আবসারিহিন্না” [সুরা নূর: ৩১] — মুমিন নারীদের বলো দৃষ্টি নত রাখতে, কিন্তু ঘরে বন্দী রাখতে বলা হয়নি। খাদিজা (রা) ব্যবসা করেছেন, আয়েশা (রা) হাদীস শিখিয়েছেন, যুদ্ধের ময়দানে নারীরা আহতদের সেবা করেছেন — বুখারী শরীফ, হাদীস নং ২৮৮১।  

জনতা নড়ে ওঠে। মাহফিলের প্যান্ডেল খালি হতে থাকে — যেন জোয়ারের পর ভাটায় চর জেগে ওঠে। ধর্মব্যবসায়ীরা হারতে থাকে। তাদের চাঁদার রশিদ বইয়ে ধুলো জমে, মাইকের ব্যাটারি ডাউন হয়ে যায়।  

এক মাঘের শীতের সকালে আজিমউদ্দিন মারা যান। জানাজার আগে আব্দুল্লাহ বাবার খালি খাঁচাটা মসজিদের পাশে পুঁতে দেয়। তার ওপর লাগায় একটা বকুল গাছ। বলে, “বাবা, তুমি আমাকে খাঁচা খুলতে শিখিয়েছিলে। আজ পুরো গ্রামের খাঁচা খুলে গেছে।”  

বছর পাঁচেক পর। ‘আলোঘর’ এখন ইউনিয়ন পাঠাগার। সুমি এখন স্কুলশিক্ষিকা, রফিক সাংবাদিক। আব্দুল্লাহর ছেলে মুক্তি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে, মেয়ে আলো ডাক্তারি পড়ছে।  

আর সেই ইসলামি দলগুলো? কেউ রাজনীতির ভাগ-বাঁটোয়ারায় হারিয়ে গেছে, কেউ গ্রেফতার হয়েছে দুর্নীতির দায়ে, কেউ নিজেরাই নিজেদের কামড়াকামড়িতে শেষ। গ্রামের মানুষ এখন বোঝে — টুপি মাথায় দিলেই ফেরেশতা হয় না, আরবি জানলেই আলেম হয় না।  

আষাঢ় আবার আসে। বাগানে টিয়ের দল ডাকে। আব্দুল্লাহর দোকানের পাশে বকুল গাছটা এখন বড় হয়েছে। তার ডালে দুটো টিয়ে এসে বসে — সবুজ ডানা, লাল ঠোঁট। আব্দুল্লাহর মনে হয়, এরা সেই ছোটবেলার মুক্ত পাখিদের নাতি-নাতনি।  

সে মদিনাখানার দোকান থেকে একমুঠো ধান ছড়িয়ে দেয়। পাখিরা খায়, ডানা ঝাপটায়, উড়ে যায় আকাশে। আব্দুল্লাহ তাকিয়ে থাকে। তার বুকের ভেতরও তখন একটা খাঁচা ভাঙার শব্দ হয় — কড়কড় করে ভাঙে কুসংস্কারের শিক, ঝনঝন করে খসে পড়ে ধর্মব্যবসার তালা।  

মসজিদ থেকে ভেসে আসে মাগরিবের আজান। আজিমউদ্দিন নেই, কিন্তু তাঁর শেখানো সুর আছে। আব্দুল্লাহ ওজু করতে করতে ভাবে — “ইমামতি মানে তো সামনে দাঁড়ানো, পথ দেখানো। পথ তো খোলা আকাশের দিকেই।”  

গ্রামের আকাশে তখন আষাঢ়ের মেঘ। বিদ্যুৎ চমকায় — যেন আল্লাহর নূর। আর সেই আলোয় আব্দুল্লাহ দেখে — ‘আলোঘর’ থেকে বেরিয়ে আসছে একদল ছেলেমেয়ে, হাতে বই, চোখে স্বপ্ন, পায়ে মুক্তির ছন্দ।  

খাঁচা ভেঙেছে। পাখিরা জিতে গেছে। আব্দুল্লাহও জিতে গেছে — কারণ সে সত্যকে খাঁচায় পুরতে দেয়নি, উড়তে দিয়েছে।

সাবস্ক্রাইব করুন! মেইল দ্বারা নিউজ আপডেট পান